প্রশান্ত মহাসাগরের নীল জলরাশি আর পামগাছে ঘেরা দ্বীপ তাহিতি। পর্যটকদের কাছে এটি এক স্বপ্নের গন্তব্য। কিন্তু এই দ্বীপের একটি ফুটবল দলের জন্য বাস্তবতা অনেকটাই ভিন্ন। বিশ্ব ফুটবলে এমন এক বিরল অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাহিতি ইউনাইটেড, যাদের প্রতিটি অ্যাওয়ে ম্যাচ যেন সময়ের সীমানা পেরিয়ে খেলার মতো।
ওশেনিয়া অঞ্চলের প্রথম পেশাদার ফুটবল লিগ ওএফসি প্রো লিগে অংশ নিচ্ছে ফ্রেঞ্চ পলিনেশিয়ার ক্লাব তাহিতি ইউনাইটেড। এই টুর্নামেন্টে তাদের প্রতিপক্ষ অস্ট্রেলিয়া, ফিজি, নিউজিল্যান্ড ও ভানুয়াতুসহ বিভিন্ন দেশের সাতটি ক্লাব। তবে নিজস্ব স্টেডিয়ামে সংস্কারকাজ চলায় দলটি আপাতত ঘরের মাঠে কোনো ম্যাচ আয়োজন করতে পারছে না। ফলে পুরো মৌসুম জুড়েই তাদের খেলতে হচ্ছে প্রতিপক্ষের মাঠে।
এই পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরেকটি ব্যতিক্রমী বিষয়। প্রতিপক্ষ দলগুলোর সবই তাহিতির পশ্চিম দিকে অবস্থিত, যা আন্তর্জাতিক তারিখ রেখার ওপারে। এই কারণে প্রতিটি ম্যাচ খেলতে গেলে তাহিতি ইউনাইটেডকে সময়ের হিসাবে যেন ‘ভবিষ্যতে’ যেতে হয়, আর দেশে ফিরলে তারা আবার এক দিন ‘অতীতে’ ফিরে আসে।
আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা হলো প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে উত্তর মেরু থেকে দক্ষিণ মেরু পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কাল্পনিক সীমারেখা, যা পৃথিবীর সময় ও তারিখ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কেউ যদি এই রেখা পশ্চিম দিকে অতিক্রম করেন, তবে তার ক্যালেন্ডারে এক দিন যোগ হয়। আবার পূর্ব দিকে অতিক্রম করলে ক্যালেন্ডার থেকে এক দিন কমে যায়।
তাহিতি থেকে ফিজির দূরত্ব প্রায় দুই হাজার মাইল হলেও সময়ের হিসাবে ফিজি এগিয়ে রয়েছে প্রায় ২২ ঘণ্টা। অর্থাৎ কেউ যদি তাহিতি থেকে ফিজিতে যান, তবে তিনি ক্যালেন্ডারের হিসাবে এক দিন সামনে চলে যাবেন। আবার ফিজি থেকে তাহিতিতে ফিরলে সময় এক দিন পিছিয়ে যাবে। ফলে তাহিতি ইউনাইটেডের সমর্থকেরা যখন নিজেদের দেশে বসে দলের ম্যাচ দেখেন, তখন ক্যালেন্ডারের হিসাবে সেই ম্যাচটি হচ্ছে পরের দিনের ঘটনা।
তাহিতির ক্লাবগুলোর জন্য দীর্ঘ ভ্রমণ অবশ্য নতুন কিছু নয়। ফরাসি শাসিত অঞ্চল হওয়ায় তারা প্রতি বছর ফ্রেঞ্চ কাপেও অংশ নেওয়ার সুযোগ পায়। ২০২১ সালে এএস ভেনাস নামের একটি ক্লাব প্রায় ২০ হাজার মাইল পথ পাড়ি দিয়ে ফ্রান্সে গিয়ে একটি ম্যাচ খেলেছিল।
তবে তাহিতি ইউনাইটেডের জন্য বর্তমান অভিজ্ঞতা আরও ব্যতিক্রমী। ক্লাবটির জেনারেল ম্যানেজার তেমায়ুই ক্রলাস বলেন, ‘লজিস্টিক সামলানোই এখানে আসল চ্যালেঞ্জ। আমাদের সব সময় ম্যাচের চেয়ে ভ্রমণ নিয়ে বেশি ভাবতে হয়। তবে এই ক্লাবটা তাহিতির খেলাধুলার জন্য এক বিরাট বিপ্লব। আমরাই দেশের প্রথম পেশাদার স্পোর্টস টিম।’
পেশাদার ফুটবলের এই যাত্রায় খেলোয়াড়দেরও দিতে হচ্ছে বড় ত্যাগ। কেউ কেউ স্থায়ী চাকরি বা সম্ভাবনাময় ক্যারিয়ার ছেড়ে দিয়েছেন ফুটবলের স্বপ্ন পূরণে। মাসের পর মাস পরিবার ও প্রিয়জনদের থেকে দূরে থাকতে হচ্ছে তাদের।
তাহিতি ফুটবল আগে থেকেই আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কিছু চমক দেখিয়েছে। ২০১২ সালে ওশেনিয়া নেশনস কাপ জিতে ফুটবলবিশ্বকে অবাক করে দেয় তারা। পরের বছর ২০১৩ কনফেডারেশনস কাপে স্পেন, নাইজেরিয়া ও উরুগুয়ের মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে খেলেছিল তাহিতি জাতীয় দল।
ওএফসি প্রো লিগে ফিজির বুলা এফসিকে ১–০ গোলে হারিয়ে প্রথম জয় তুলে নেয় তাহিতি ইউনাইটেড। পরে পাপুয়া নিউ গিনির ক্লাব হেকারিকেও হারিয়ে তারা নিজেদের সক্ষমতার বার্তা দেয়। দলের কোচ স্যামুয়েল গার্সিয়া বলেন, ‘পেশাদার লিগে প্রথম জয় পাওয়াটা আমাদের জন্য এক মাইলফলক। এটা প্রমাণ করেছে, আমরা সঠিক পথেই আছি।’
এই টুর্নামেন্টে খেলতে পুরো মৌসুমে তাহিতি ইউনাইটেডের ফুটবলারদের প্রায় ৩০ হাজার মাইল ভ্রমণ করতে হবে। প্রায় এক সপ্তাহ সময় কেটে যাবে বিমানে ভ্রমণ করেই। চার মাসের এই যাত্রায় অন্তত ১২ বার আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা অতিক্রম করবেন তারা।
তাহিতি ইউনাইটেডের অধিনায়ক ও দেশের ফুটবল কিংবদন্তি তেওনুই তেহাউ মনে করেন, দীর্ঘ ভ্রমণের এই অভিজ্ঞতা দলকে আরও ঐক্যবদ্ধ করে তুলছে। তাঁর মতে, কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়েই দল হিসেবে তারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠছে।
তবে ক্লাবটির বড় স্বপ্ন এখন একটাই—নিজেদের ঘরের মাঠে সমর্থকদের সামনে আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচ খেলা। স্টেডিয়ামের সংস্কারকাজ চলায় ২০২৮ সালের আগে হয়তো সেই সুযোগ মিলবে না।
তত দিন পর্যন্ত তাহিতির সমর্থকদের দূর থেকেই দলের জন্য সমর্থন জানাতে হবে। আন্তর্জাতিক তারিখ রেখা হয়তো তাদের সময়ের হিসাবে বারবার অতীতে ফেরায়, কিন্তু তাহিতি ইউনাইটেডের ফুটবলাররা ঠিকই এগিয়ে চলেছেন ভবিষ্যতের স্বপ্ন নিয়ে।
সিএ/এমই


