২০৩০ সালের ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনকে কেন্দ্র করে মরক্কোর বিরুদ্ধে এক বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্পেন, পর্তুগাল, আর্জেন্টিনা, উরুগুয়ে এবং প্যারাগুয়ের সঙ্গে এই বিশ্বকাপের সহ-আয়োজক মরক্কো। অভিযোগ উঠেছে, বিশ্বকাপের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে মরক্কো অপ্রয়োজনীয়ভাবে কুকুর হত্যা করছে। তবে দেশটির সরকার এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
আন্তর্জাতিক প্রাণী কল্যাণ ও সংরক্ষণ কোয়ালিশন (আইএডব্লিউপিসি) জানিয়েছে, মরক্কোর এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে প্রায় ৩০ লাখ কুকুর বিপদে পড়তে পারে। ডেইলি মেইলের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হত্যার পদ্ধতির মধ্যে স্ট্রাইকাইন বিষ প্রয়োগ, গুলি চালানো এবং কিছু কুকুরকে জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া অন্তর্ভুক্ত। এসব কার্যক্রম শহরের রাস্তা ‘পরিষ্কার’ করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে, যাতে পর্যটক ও প্রতিনিধিদল আগমনের আগে শহর প্রস্তুত থাকে।
তবে মরক্কোর রাজধানী রাবাতের শহর কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। লন্ডনে মরক্কোর দূতাবাসের মুখপাত্র বলেছেন, “ভবঘুরে কুকুর নিধনের কোনো কার্যক্রম নেই। আমরা মানবিক ও টেকসই প্রাণী ব্যবস্থাপনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
মরক্কোর প্রশাসন জানিয়েছে, তারা ২০১৯ সাল থেকে টিএনভিআর (ট্র্যাপ, নিউটার, ভ্যাকসিনেট, রিলিজ) কর্মসূচি চালাচ্ছে। এই প্রকল্পের আওতায় কুকুরদের ধরা, বন্ধ্যত্ব করানো, ভ্যাকসিন দেওয়া এবং পুনরায় ছাড়া হয়। বিশেষ ক্লিনিকে এর জন্য ২ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি বিনিয়োগ করা হয়েছে। একই সময়ে তানজিয়ারের হায়াত প্রকল্প ৪,৬০০-এর বেশি কুকুরকে সহায়তা করেছে।
আইএডব্লিউপিসির পরিচালক লেস ওয়ার্ড সিএনএনকে বলেছেন, ‘রাতের অন্ধকারে রাইফেল হাতে মানুষ রাস্তায় বের হয়ে কুকুরকে গুলি করে, আবার অন্যদের পৌর স্বাস্থ্য ক্লিনিকে বিষ খাওয়ানো হয়েছে। এমনকি কিছু কুকুর, যাদের বন্ধ্যত্ব করা হয়েছে, তারা ও ক্ষতির শিকার হয়েছে।’
আইএডব্লিউপিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিশ্বকাপের আয়োজক হওয়ার পর কুকুর নিধনের ঘটনা নাটকীয়ভাবে বেড়েছে। আশঙ্কা করা হচ্ছে, মরক্কো ৩০ লাখ কুকুর হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে এগোতে পারে।’
হলিউড অভিনেতা মার্ক রাফালো এক্সে পোষ্টে বলেছেন, ‘একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া ইভেন্টের প্রস্তুতির জন্য লাখ লাখ কুকুরকে হত্যা করা অগ্রগতি নয়। এটি নৈতিক ব্যর্থতা।’
দ্য অ্যাথলেটিকের সাংবাদিক সাইমন হিউজের অনুসন্ধান অনুযায়ী, ১০টি সংস্থা আইএডব্লিউপিসিকে খোলা চিঠি পাঠিয়েছে। তারা বলেছেন, কুকুর হত্যা জাতীয় আইন ও টিএনভিআর প্রকল্পের তহবিল বরাদ্দ নীতির বিরোধী। এছাড়াও, কোনো ব্যক্তি যদি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রাণী হত্যা, নির্যাতন বা আঘাত করে, তবে কঠোর শাস্তি ও জরিমানা কার্যকর করতে হবে।
মরক্কোর প্রাণী আইন নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। একদিকে প্রাণী নির্যাতনের শাস্তি রয়েছে, অন্যদিকে যারা আশ্রয়, খাবার বা চিকিৎসা দেয় তাদের জরিমানা করতে পারে। ফলে সাধারণ মানুষ পথের কুকুরদের সহায়তা করতে নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
মরক্কোর সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে প্রতিবছর জলাতঙ্কে প্রায় ৩৩ জন মারা যায় এবং প্রায় এক লাখ মানুষ পথের কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চিহ্নিত কুকুরগুলোকে হত্যা না করে একই জায়গায় ফিরিয়ে দেওয়া উচিত, যাতে তারা জলাতঙ্ক প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ও আইএডব্লিউপিসি সতর্ক করেছে, গণহারে কুকুর নিধন করলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। বিশ্বকাপ প্রস্তুতি, প্রাণী কল্যাণ এবং জনস্বাস্থ্যের প্রশ্ন মিলিয়ে বিষয়টি এখন আন্তর্জাতিক নজরদারির কেন্দ্রে।
সিএ/এমই


