সমুদ্রের গভীরে তিমির জন্মদানের এক বিরল ও বিস্ময়কর দৃশ্য তুলে ধরেছেন বিজ্ঞানীরা, যেখানে দেখা গেছে—মা তিমি সন্তান প্রসবের সময় একা থাকে না, বরং আশপাশের অন্যান্য স্ত্রী তিমিরা সম্মিলিতভাবে তাকে সহায়তা করে। গবেষণায় উঠে এসেছে, নবজাতককে নিরাপদ রাখতে এবং প্রথম শ্বাস নিতে সহায়তা করতে দলবদ্ধভাবে কাজ করে তিমিরা।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, জন্মদানের সময় মা তিমিটিকে ঘিরে রেখেছিল একাধিক পূর্ণবয়স্ক স্ত্রী তিমি। তারা পর্যায়ক্রমে নবজাতক বাচ্চাটিকে পানির উপরিভাগে তুলে ধরে, যাতে জন্মের পরপরই সে শ্বাস নিতে পারে। পুরো প্রক্রিয়ায় তিমিদের মধ্যে সমন্বিত আচরণ লক্ষ্য করা গেছে, যা তাদের উচ্চমাত্রার সামাজিকতা ও বুদ্ধিমত্তার প্রমাণ বহন করে।
ক্যারিবীয় সাগরের পূর্বদিকে ডমিনিকা উপকূলের কাছে এই ঘটনাটি ধারণ করা হয়। সামুদ্রিক জীববিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বন্য পরিবেশে স্পার্ম হোয়েল বা অন্যান্য সিটাসিয়ান প্রাণীর জন্মদানের এত বিস্তারিত চিত্র এর আগে খুব কমই পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ঘটনাস্থলে মোট ১১টি তিমি উপস্থিত ছিল। এর মধ্যে মা তিমিসহ ১০টি স্ত্রী তিমি এবং একটি কিশোর পুরুষ তিমি ছিল, যা পুরো প্রক্রিয়ায় পর্যবেক্ষকের ভূমিকা পালন করেছে। তারা সবাই মিলে নবজাতকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্রিয়ভাবে অংশ নেয়।
২০২৩ সালের ৮ জুলাই ‘প্রজেক্ট সিএটিআই’ নামের একটি গবেষণা দলের বিজ্ঞানীরা ড্রোন ভিডিও, পানির নিচের শব্দ রেকর্ড এবং জাহাজ থেকে তোলা ছবির মাধ্যমে পুরো ঘটনাটি ধারণ করেন। তিমির লেজ দেখা যাওয়ার পর থেকে জন্ম সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত সময় লেগেছে প্রায় ৩৪ মিনিট।
গবেষণার প্রধান লেখক আলা মাওলুফ বলেছেন, “বাচ্চাটি জন্ম নেওয়ার ঠিক পরেই আমরা সহযোগিতামূলক সেবার এক দৃশ্য দেখতে পাই। তিমিরা নবজাতকের আশপাশে খুব ঘন হয়ে এক জটলা তৈরি করেছিল এবং বারবার একে স্পর্শ করছিল। এরা নিজেদের শরীর দিয়ে বাচ্চাটিকে ধরে রাখছিল এবং পর্যায়ক্রমে ঠেলে পানির উপরিভাগের দিকে তুলে ধরছিল। এ প্রক্রিয়াটি বেশ কয়েক ঘণ্টা ধরে চলেছে।”
সহ-গবেষক ডেভিড গ্রুবার বলেন, “স্পার্ম হোয়েলদের জন্য জন্মমুহূর্তটি ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ মানুষের বাচ্চার মতোই এরা জন্মের সময় নড়াচড়া করতে পারে না ও একেবারেই অসহায় থাকে। পানিতে ডুবে যাওয়া ঠেকাতে এবং প্রথমবার শ্বাস নেওয়ার জন্য এদের অন্যদের তাৎক্ষণিক সাহায্যের প্রয়োজন হয়।”
গবেষণার ফলাফল ‘সায়েন্স’ ও ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, তিমিদের এ ধরনের সহযোগিতামূলক আচরণ তাদের জটিল সামাজিক কাঠামো ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতার ইঙ্গিত দেয়। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, জন্মদানের সময় সহযোগিতা করা তিমিগুলো ভিন্ন পরিবারের হলেও তারা একত্রে কাজ করেছে।
সিএ/এমআর


