চেরনোবিল দুর্ঘটনার প্রায় চার দশক পর এই অঞ্চলটি এক অনন্য বাস্তুতন্ত্রে পরিণত হয়েছে, যা পৃথিবীর অন্য কোথাও দেখা যায় না। ১৯৮৬ সালের ২৬ এপ্রিলের ভয়াবহ পারমাণবিক বিস্ফোরণের পর ধারণা করা হয়েছিল, দীর্ঘ সময় ধরে এই এলাকা প্রাণহীন হয়ে থাকবে। কিন্তু বাস্তবতা সেই ধারণাকে ভুল প্রমাণ করেছে।
দুর্ঘটনার পর সবচেয়ে বেশি বিকিরণযুক্ত এলাকা ‘এক্সক্লুশন জোন’ নামে পরিচিত। ইউক্রেন অংশে এর আয়তন প্রায় ২,৬০০ বর্গকিলোমিটার এবং বেলারুশসহ মোট এলাকা সাড়ে চার হাজার বর্গকিলোমিটারের বেশি। দীর্ঘদিন মানবশূন্য থাকার ফলে এখানে প্রকৃতি নিজস্ব গতিতে পুনর্গঠনের সুযোগ পেয়েছে।
প্রাথমিক পর্যায়ে পরিস্থিতি ছিল ভয়াবহ। রিঅ্যাক্টরের কাছাকাছি পাইন বন বিকিরণে ধ্বংস হয়ে যায় এবং গাছের রং লালচে হয়ে পড়ে, যা ‘রেড ফরেস্ট’ নামে পরিচিত। অনেক ছোট প্রাণী ও পোকামাকড়ও হারিয়ে যায়। তবে সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে যায়।
বর্তমানে এই এলাকায় বড় প্রাণীদের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়। নেকড়ে, ভালুক, হরিণ, বন্য শূকর, এমনকি বন্য ঘোড়াও এখানে বসবাস করছে। নদী ও খালে ফিরে এসেছে বিভার। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল কারণ বিকিরণ নয়, বরং মানুষের অনুপস্থিতি। মানুষের চাপ না থাকায় প্রাণীরা স্বাভাবিকভাবে বিস্তার লাভ করেছে।
চেরনোবিল নিয়ে মানুষের কল্পনায় বিকৃত প্রাণীর ধারণা থাকলেও বাস্তবে তা খুব কম দেখা যায়। গুরুতর বিকৃতি থাকা প্রাণীরা সাধারণত বেঁচে থাকতে পারে না, ফলে প্রকৃতি নিজেই একটি ভারসাম্য তৈরি করেছে।
এ অঞ্চলের ব্যাঙের মধ্যেও পরিবর্তন দেখা গেছে। ইস্টার্ন ট্রি ফ্রগের অনেকগুলো এখন গাঢ় কালচে রঙ ধারণ করেছে। মেলানিনের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা বিকিরণ থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাচ্ছে বলে ধারণা করা হয়।
এছাড়া চেরনোবিলে কালো মেলানিনসমৃদ্ধ ছত্রাকের উপস্থিতিও বিজ্ঞানীদের বিস্মিত করেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, এই ছত্রাক বিকিরণের মধ্যেই দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ধারণা করা হচ্ছে, তারা বিকিরণকে কোনোভাবে কাজে লাগাতে সক্ষম।
দুর্ঘটনার সময় ফেলে যাওয়া পোষা কুকুরের বংশধররাও এখন সেখানে বাস করছে। দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকার কারণে তাদের জিনগত বৈশিষ্ট্যে পরিবর্তন এসেছে এবং তারা অন্য অঞ্চলের কুকুরদের থেকে আলাদা হয়ে গেছে।
একসময় এই অঞ্চলের বন ছিল নীরব, পাখির ডাক বা পোকামাকড়ের শব্দ শোনা যেত না। এখন সেই নীরবতা ভেঙে গেছে। বিভিন্ন প্রজাতির পাখি আবার ফিরে এসেছে এবং বনভূমি নতুন প্রাণে ভরে উঠেছে।
চেরনোবিল প্রমাণ করে যে প্রকৃতি কখনো থেমে থাকে না। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও এটি নতুন ভারসাম্য তৈরি করে, যদিও তা আগের মতো নয়, বরং ভিন্ন এক রূপে।
সিএ/এমআর


