হাজার বছরের ইতিহাস সংরক্ষণ সম্ভব হতে যাচ্ছে মাত্র এক টুকরো কাঁচে। তথ্য সংরক্ষণের এক বৈপ্লবিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনের দাবি করেছেন বিজ্ঞানীরা, যা ভবিষ্যতে মানব সভ্যতার জ্ঞান সংরক্ষণের ধরণই বদলে দিতে পারে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই কাঁচের স্টোরেজে হাজার হাজার বছর ধরে তথ্য অক্ষত রাখা সম্ভব।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশেষ ধরনের লেজার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কাঁচের ভেতরে তথ্যের সংকেত খোদাই করা যায়। এই পদ্ধতিতে সংরক্ষিত তথ্য ১০ হাজার বছরেরও বেশি সময় টিকে থাকতে সক্ষম।
বর্তমান বিশ্বে তথ্য উৎপাদনের পরিমাণ অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এসব তথ্য সংরক্ষণ করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রচলিত হার্ডডিস্ক বা ডিজিটাল স্টোরেজ দীর্ঘদিন টেকে না। ফলে বিপুল পরিমাণ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভবিষ্যতে হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এই বাস্তবতায় বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, কাঁচের মধ্যে তথ্য সংরক্ষণ মানব সভ্যতার দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান সংরক্ষণের কার্যকর সমাধান হতে পারে। তবে এতদিন কাঁচের ওপর তথ্য লেখা বা সেখান থেকে পুনরায় তথ্য উদ্ধার করা প্রায় অসম্ভব বলেই বিবেচিত হতো।
মাইক্রোসফটের ‘প্রজেক্ট সিলিকা’ নামের একটি গবেষণা প্রকল্পের আওতায় বিজ্ঞানীরা সেই অসম্ভবকেই সম্ভব করার দাবি করেছেন। তাদের ব্যবহৃত বিশেষ লেজার কাঁচের ভেতরে ‘ভক্সেল’ নামে ত্রিমাত্রিক পিক্সেল তৈরি করে, যার মাধ্যমে বিপুল তথ্য সংরক্ষণ করা যায়।
মাত্র ১২ বর্গ সেন্টিমিটার আয়তন এবং ২ মিলিমিটার পুরুত্বের একটি কাঁচের টুকরোয় ৪.৮৪ টেরাবাইট তথ্য জমা রাখা সম্ভব। যা প্রায় ২০ লাখ বই বা ৫ হাজারটি ফোরকে মানের সিনেমার সমান।
পরীক্ষায় দেখা গেছে, ২৯০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রাতেও এই কাঁচের স্টোরেজ প্রায় ১০ হাজার বছর পর্যন্ত টিকে থাকতে পারে। বিজ্ঞানীদের মতে, সাধারণ কক্ষ তাপমাত্রায় এর স্থায়িত্ব আরও বেশি হতে পারে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, কাঁচটি যান্ত্রিক আঘাত বা রাসায়নিক ক্ষয়ের শিকার হলে এর গুণগত মান নষ্ট হতে পারে এবং ভেতরে সংরক্ষিত তথ্য হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
গবেষণা দলের বাইরে থাকা বিজ্ঞানীরাও মনে করছেন, এই উদ্ভাবন মানব ইতিহাসে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। অতীতে যেমন কাগজ বা ছাপাখানা তথ্য সংরক্ষণে বিপ্লব এনেছিল, ঠিক তেমনি এই কাঁচের স্টোরেজ প্রযুক্তিও নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে।
গবেষক ফেং চেন ও বো উ তাদের নিবন্ধে বলেছেন, বড় পরিসরে এই প্রযুক্তি বাস্তবায়ন করা গেলে জ্ঞান সংরক্ষণের ইতিহাসে এটি একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে। একদিন হয়তো কাঁচের একটি ছোট টুকরো হাজার বছর ধরে মানব সংস্কৃতি ও জ্ঞানের বাহক হয়ে থাকবে।
‘লেজার রাইটিং ইন গ্লাস ফর ডেন্স, ফাস্ট অ্যান্ড এফিশিয়েন্ট আর্কাইভাল ডেটা স্টোরেজ’ শিরোনামে গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল নেচার-এ প্রকাশিত হয়েছে।
সিএ/এমআর


