বাংলা ভাষা কম্পিউটার ও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে এখন মোবাইল এবং ইন্টারনেট জগতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রিন্টিং দুনিয়া থেকে শুরু করে আজকের অনলাইন মিডিয়া, বাংলা লেখা, পড়া এবং শেয়ার করা এখন অত্যন্ত সহজ। বাংলা কিভাবে কম্পিউটার ও মোবাইলের পর্দায় প্রবেশ করেছে, তা এই প্রতিবেদনে তুলে ধরা হলো।
কম্পিউটারে বাংলা লেখার ইতিহাসে প্রথম ধাপ টাইপরাইটার থেকে শুরু। টাইপরাইটারের জন্য বাংলার কোন বৈজ্ঞানিক কি-বোর্ড ছিল না। ১৯৬৫ সালে শহীদ মুনীর চৌধুরী বাংলার ম্যানুয়াল কি-বোর্ডের জন্য শব্দের পৌনঃপুনিকতা যাচাই করে প্রথম বৈজ্ঞানিক লে–আউট প্রণয়ন করেন, যা ‘অপটিমা মুনীর’ নামে পরিচিত। ১৯৮৪ সালে শহীদলিপি সফটওয়্যার বাজারে আসে, যা কম্পিউটারে বাংলায় টাইপিং সম্ভব করে। ১৯৮৮ সালে ম্যাকিন্টোশ ও পরে উইন্ডোজ ৩.১-এ ব্যবহারের জন্য বিজয় ফন্ট ও কি-বোর্ড প্যাকেজ প্রকাশিত হয়।
বিজয় সফটওয়্যার নির্মাতা মোস্তাফা জব্বার বলেন, ‘বিজয় লে–আউট তৈরি করতে বাংলা শব্দের ফ্রিকোয়েন্সি যাচাই করেছি। সফটওয়্যারের মান উন্নয়নে নিয়মিত কাজ করেছি। এটি ম্যাকিন্টোশ, উইন্ডোজ, আসকি ও ইউনিকোড—সব ক্ষেত্রে ব্যবহারযোগ্য।’
ইউনিকোডের সূচনা ১৯৮৭ সালে অ্যাপল কম্পিউটারের উদ্যোগে। ১৯৯১ সালে ইউনিকোডের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়, যা ডেস্কটপ ও অনলাইনে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে নতুন অধ্যায় সূচনা করে। ইউনিকোড ফন্টনির্ভর এবং বিশেষ সফটওয়্যারের উপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশে জাতীয় কি–বোর্ড লে–আউট সরকার স্বীকৃত এবং ইউনিকোড সমর্থন করে। লিনাক্সসহ সব অপারেটিং সিস্টেমে এই লে–আউট ব্যবহার করে বাংলা লেখা সম্ভব।
বাংলাদেশ ইউনিকোড কনসোর্টিয়ামে ২০১০ সালে সদস্য হয়। মোস্তাফা জব্বার অ্যাপলের ১৯৮৮ সালের সম্মেলনে বাংলা বর্ণ সমূহের সম্পূর্ণ অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেন। পরে .বাংলা টপ লেভেল ডোমেইন নামের বিষয়েও বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হয়।
ইন্টারনেটে বাংলা লেখার ক্ষেত্রে প্রধান সফটওয়্যার হলো অভ্র। অভ্র ফোনেটিক ও অন্যান্য লে–আউটে লেখার সুবিধা দেয়। ২০০৩ সালের ২৬ মার্চ মেহদী হাসান খান উইন্ডোজভিত্তিক ইউনিকোড সফটওয়্যার অভ্র প্রকাশ করেন। অভ্র বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য এবং ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সরাসরি ডাউনলোড করা সম্ভব। অভ্রের লে–আউটগুলো হলো বিজয় বাংলা, অভ্র ইজি, ন্যাশনাল, প্রভা, মুনীর অপটিমা ও ইউনি বিজয়। অভ্রের স্লোগান, ‘ভাষা হোক উন্মুক্ত’।
বর্তমানে ইউনিকোড স্ট্যান্ডার্ডের ১৭.০ সংস্করণ চালু আছে। এতে প্রচলিত ও অপ্রচলিত অনেক বর্ণ, বাংলাদেশের টাকার চিহ্ন এবং ঐতিহাসিক ভগ্নাংশ লেখার সুবিধা অন্তর্ভুক্ত।
মোবাইলেও বাংলা লেখার জন্য বিভিন্ন অ্যাপ তৈরি হয়েছে। রিদমিক কি–বোর্ড অ্যান্ড্রয়েডে ১০ কোটি বার এবং বাংলা কি–বোর্ড ৫০ লাখবার ডাউনলোড হয়েছে। গুগলের জি-বোর্ডের মাধ্যমে অনেকে বাংলা লিখছেন।
ভবিষ্যতের প্রসঙ্গে অভ্রর বিকাশে যুক্ত তানবিন ইসলাম বলেন, ‘বাংলা ইউনিকোডের অবস্থান ইতিবাচক। প্রাচীন বাংলা গ্রন্থ ও দলিল ডিজিটাল আর্কাইভিং, ভ্যারিয়েবল ও মোনোস্পেস ফন্টের উন্নয়নসহ আরও কাজের সুযোগ রয়েছে। সরকারের প্রজেক্টগুলো ওপেন সোর্স করা উচিত, যাতে কমিউনিটি উন্নয়ন ও রক্ষণাবেক্ষণে অবদান রাখতে পারে। ফন্ট ও সফটওয়্যার এক জায়গায় সংরক্ষণ করলে সাধারণ ব্যবহারকারীর সুবিধা বাড়বে।’
সিএ/এমই


