আধুনিক গবেষণাগার, বৈজ্ঞানিক জার্নাল কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগ শুরুর বহু আগেই মুসলিম বিশ্বে গড়ে উঠেছিল এক সমৃদ্ধ জ্ঞানসভ্যতা। বাগদাদ, কর্ডোবা, সমরকন্দ ও কায়রোর মতো নগরীগুলো তখন ছিল জ্ঞানচর্চার কেন্দ্র। সেই সময় জ্ঞান অর্জন শুধু পেশা নয়, বরং নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব হিসেবেই বিবেচিত হতো। এই ধারাবাহিকতায় জন্ম নিয়েছিলেন এমন সব মুসলিম বিজ্ঞানী, যাদের চিন্তা ও আবিষ্কার আজও আধুনিক বিজ্ঞান, চিকিৎসা, প্রযুক্তি ও দর্শনে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
ইতিহাসবিদদের ভাষায়, অষ্টম থেকে চতুর্দশ শতক পর্যন্ত সময়কাল ইসলামের স্বর্ণযুগ হিসেবে পরিচিত। এই সময়ে মুসলিম মনীষীরা গ্রিক, পারস্য, ভারতীয় ও রোমান সভ্যতার জ্ঞান সংরক্ষণ করেন এবং তা আরও বিকশিত করেন। গণিত, চিকিৎসা, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন ও প্রকৌশলে তারা নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন, যা পরবর্তী ইউরোপীয় রেনেসাঁর ভিত্তি গড়ে দেয়।
এই স্বর্ণযুগের অন্যতম প্রভাবশালী বিজ্ঞানী ছিলেন আল-খাওয়ারিজমি। বাগদাদের বায়তুল হিকমায় কর্মরত এই মনীষী বীজগণিতকে একটি স্বতন্ত্র শাস্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। তার নাম থেকেই ‘অ্যালগরিদম’ শব্দটির উৎপত্তি, যা আজকের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও কম্পিউটার বিজ্ঞানের ভিত্তি।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে অনন্য অবদান রেখেছেন ইবনে সিনা। তার রচিত কানুন ফিত-তিব শত শত বছর ধরে ইউরোপ ও মুসলিম বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্য ছিল। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা ব্যবস্থায় তার চিন্তাধারা আজও প্রাসঙ্গিক।
আল-রাজি পরীক্ষামূলক চিকিৎসার পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তিনি গুটি বসন্ত ও হামকে পৃথক রোগ হিসেবে শনাক্ত করেন এবং চিকিৎসাবিদ্যায় পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন। একই সঙ্গে রসায়নে তার গবেষণা আধুনিক কেমিস্ট্রির ভিত্তি শক্ত করে।
আল-বিরুনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। আধুনিক যন্ত্র ছাড়াই তিনি পৃথিবীর ব্যাসার্ধ নির্ণয় করেন এবং ভূগোল, সংস্কৃতি ও ধর্ম নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে বহুসাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দেন।
বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশে ইবনে আল-হাইসামের অবদান অনস্বীকার্য। আলো ও দৃষ্টির ওপর তার গবেষণা আধুনিক অপটিক্সের ভিত্তি স্থাপন করে। পরীক্ষানির্ভর গবেষণার যে ধারা তিনি চালু করেছিলেন, তা আজকের বিজ্ঞানের মূল ভিত্তি।
গ্রিক ও ভারতীয় জ্ঞানভান্ডার সংরক্ষণ ও অনুবাদের মাধ্যমে আল-কিন্দি সভ্যতার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করেন। জ্ঞান যে কোনো একক জাতির সম্পত্তি নয়—এই ধারণা তিনি প্রতিষ্ঠা করেন।
ইবনে রুশদ ধর্ম ও যুক্তির সমন্বয়ে বিশ্বাস করতেন। তার চিন্তাধারা ইউরোপীয় দর্শন ও যুক্তিবাদের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
আধুনিক অস্ত্রোপচারের পথপ্রদর্শক হিসেবে পরিচিত আল-জাহরাউই। তার উদ্ভাবিত বহু অস্ত্রোপচার যন্ত্র আজও আধুনিক সার্জারিতে ব্যবহৃত নকশার ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত।
রসায়নের ভিত্তি নির্মাণে জাবির ইবনে হাইয়ানের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পরীক্ষাগারভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে তিনি পদার্থ বিশ্লেষণের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেন।
জ্যোতির্বিজ্ঞানে নাসির উদ্দিন আল-তুসি নতুন গাণিতিক মডেল তৈরি করেন এবং মানমন্দির প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার গুরুত্ব তুলে ধরেন।
এই বিজ্ঞানীদের একটি মিল ছিল—তারা বিশ্বাস করতেন জ্ঞান অর্জন ইবাদতের অংশ, কৌতূহল একটি নৈতিক গুণ এবং জ্ঞান সবার জন্য উন্মুক্ত। তাদের অবদান প্রমাণ করে, মানব সভ্যতার অগ্রগতি কোনো একক জাতি বা কালের সম্পত্তি নয়; বরং এটি সমগ্র মানবজাতির সম্মিলিত অর্জন।
সিএ/এমআর


