অনলাইন শিক্ষা, আর্থিক সেবা গ্রহণ, দৈনন্দিন কাজ সম্পাদন এবং তথ্যপ্রাপ্তি—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের ডিজিটাল রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে মোবাইল ফোন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিস্তারের ফলে এসব সুবিধা আরও দ্রুত ও সহজলভ্য হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাপন, কর্মসংস্থান এবং পারস্পরিক যোগাযোগে। বর্তমানে বাংলাদেশের ৯৬ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহারকারী নিয়মিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করেন, যা ২০২৪ সালের তুলনায় ৮ শতাংশ বেশি।
বিল্ডিং ট্রাস্ট ইন বাংলাদেশ’স এআই ফিউচার শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এক হাজার ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর ওপর পরিচালিত এই গবেষণার এটি চতুর্থ সংস্করণ। প্রতিবেদনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অগ্রযাত্রার পাশাপাশি দায়িত্বশীল, নৈতিক ও নিরাপদ ব্যবহার নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে।
টেলিনর এশিয়ার প্রধান ইওন ওমুন্ড রেভহগ বলেন, বাংলাদেশে দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিতে মোবাইল ফোন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। স্মার্ট ও আরও সংযুক্ত সমাজ গঠনে এটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। প্রাত্যহিক জীবনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বৃদ্ধি টেলিকম অপারেটরদের জন্য নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নির্মাণে নতুন সুযোগ ও দায়িত্ব এনে দিয়েছে। সংযোগ হলো ভিত্তি, আর এর প্রতিটি স্তরে আস্থা গড়ে তোলা অপরিহার্য। বাংলাদেশের ডিজিটাল অগ্রযাত্রাকে এগিয়ে নিতে এবং সবার কাছে নিরাপদ ও সুরক্ষিতভাবে মোবাইল প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে সংকল্পবদ্ধ টেলিনর এশিয়া।
গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে অনলাইন শিক্ষা ৬২ শতাংশ, দূরবর্তী কাজ ৫৪ শতাংশ এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে মোবাইল প্রযুক্তি স্মার্ট জীবনধারাকে এগিয়ে নিচ্ছে। গত এক বছরে দূরবর্তী কাজের ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যবহারে ৩৯ শতাংশ এবং বাজেট ও ব্যয় ব্যবস্থাপনায় ৩৬ শতাংশ বৃদ্ধি লক্ষ্য করা গেছে।
প্রজন্মভেদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের ধরনেও পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। স্মার্ট হোম ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ এবং ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্টের মতো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ফিচারের গুরুত্ব সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করছে মিলেনিয়ালরা। এতে বোঝা যাচ্ছে, মোবাইল ব্যবহারের বিস্তার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে মানুষের দৈনন্দিন জীবনে আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করছে।
বাংলাদেশে প্রায় ১০ জনের মধ্যে ৬ জন প্রতিদিন কোনো না কোনোভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছেন। স্কুল, অফিস কিংবা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে কনটেন্ট তৈরি, স্বাস্থ্য, আর্থিক সেবা ও ভ্রমণ পরিকল্পনায় ব্যক্তিগত পরামর্শ নিতে এই প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। অনলাইন কেনাকাটা ও কর্মক্ষেত্রেও এর ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে, যা ইঙ্গিত দেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে।
শিক্ষামূলক কনটেন্ট এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চ্যাটবটের ওপর মানুষের আস্থা তুলনামূলক বেশি। এই আস্থাই শিক্ষা ও অর্থনীতিতে নতুন সম্ভাবনার আশা জাগাচ্ছে।
কর্মক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের হার ২০২৫ সালে ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৬২ শতাংশে পৌঁছেছে। তবে ব্যবহারকারীদের মাত্র অর্ধেক জানিয়েছেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কোনো আনুষ্ঠানিক কৌশল রয়েছে। এতে দায়িত্বশীল ব্যবহারের জন্য আরও সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনার প্রয়োজনীয়তা দেখা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কাজে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মাত্র ২৮ শতাংশ, যা ভবিষ্যতে বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতির কারণে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, চাকরির ভবিষ্যৎ এবং অতিনির্ভরতা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। তরুণ প্রজন্ম সবচেয়ে বেশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করলেও তারাই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রকাশ করেছেন।
ইওন ওমুন্ড আরও বলেন, প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবার জন্য সংযোগ এবং নিরাপদ ডিজিটাল দক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি। সংযুক্ত না থাকলে কিংবা নিরাপদভাবে ডিজিটাল জগৎ ব্যবহারের সক্ষমতা না থাকলে মানুষ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হতে পারে। ডিজিটাল বৈষম্য কমিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনের ওপর জোর দেন তিনি।
সিএ/এমআর


