এই তো মনে হয় বছর শুরু হয়েছিল, আর মুহূর্তের মধ্যেই ডিসেম্বর এসে হাজির। অনেকের কাছেই মনে হয়, পুরো বছরটা যেন চোখের সামনে দিয়েই উড়ে গেল। সময় হঠাৎ এত দ্রুত চলে যাচ্ছে কেন—এই প্রশ্ন প্রায় সবার মনেই ঘোরে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আসলে সময় নিজে দ্রুত বা ধীরে চলে না। বদলে যায় মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে সময়কে বোঝে ও ব্যাখ্যা করে।
বিজ্ঞানীরা বলেন, সময়কে আমরা সরাসরি অনুভব করি না। রং দেখা যায়, শব্দ শোনা যায়, স্বাদ পাওয়া যায়—কারণ এগুলো বাহ্যিকভাবে উপস্থিত থাকে। কিন্তু সময়ের কোনো দৃশ্যমান বা স্পর্শযোগ্য অস্তিত্ব নেই। ফলে মস্তিষ্ক সময়কে দেখে না, বরং চারপাশের পরিবর্তন ও ঘটনার সংখ্যা দেখে সময় অনুমান করে। যত বেশি ঘটনা ঘটে, যত বেশি পরিবর্তন চোখে পড়ে, মস্তিষ্ক তত বেশি সময় পেরিয়েছে বলে ধরে নেয়।
এই কারণেই ভয়, উত্তেজনা বা রোমাঞ্চের মুহূর্তে সময় ধীরে চলার অনুভূতি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, দুর্ঘটনা বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতিতে থাকা মানুষ পরে বলেন, সেই সময়টুকু তাদের কাছে অনেক দীর্ঘ মনে হয়েছে। একটি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীদের প্রায় ৩০ মিটার উচ্চতা থেকে নিরাপত্তা জালে পড়তে দেওয়া হয়। পরে তারা জানান, কয়েক সেকেন্ডের সেই অভিজ্ঞতা বাস্তব সময়ের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘ বলে তাদের মনে হয়েছে। কারণ, ভয় বা উত্তেজনার সময় মস্তিষ্ক অতিরিক্ত সতর্ক থাকে এবং মুহূর্তগুলো খুব গভীরভাবে স্মৃতিতে জমা হয়। পরে সেই স্মৃতি মনে করলে সময় দীর্ঘ বলে মনে হয়।
অন্যদিকে আনন্দ, কাজের চাপ বা মনোযোগের সময় সময় দ্রুত কেটে যায় বলে মনে হয়। কেউ ডাক্তারের চেম্বারে বসে অপেক্ষা করলে পাঁচ মিনিটও দীর্ঘ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রিয় কাজে ডুবে থাকলে ঘণ্টা কেটে যায় টের না পেয়েই। মস্তিষ্ক যখন সময়ের দিকে মনোযোগ দেয়, তখন সময় ধীরে যায় বলে মনে হয়। আর মন যদি অন্য কাজে ব্যস্ত থাকে, সময়ের হিসাব আর থাকে না। একঘেয়েমি সময়কে টেনে লম্বা করে, আর ব্যস্ততা সময়কে ছোট করে দেয়।
এই দুই বিপরীত অনুভূতি থেকেই আসে পরিচিত বাস্তবতা—দিন অনেক দীর্ঘ মনে হলেও বছর দ্রুত শেষ হয়ে যায়। শৈশব ও কৈশোরে জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতা নতুন হয়। নতুন স্কুল, নতুন বন্ধু, নতুন কাজ—সবকিছুই স্মৃতিতে গভীর ছাপ ফেলে। তাই পেছনে তাকালে মনে হয়, অনেক সময় পেরিয়েছে। কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জীবনে রুটিন ঢুকে পড়ে। একই কাজ, একই পরিবেশ, একই পথ—নতুনত্ব কমে যায়। স্মৃতিও তুলনামূলক কম জমে। ফলে বছরের শেষে মনে হয়, সময়টা খুব দ্রুত কেটে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়কে ধীর করা সম্ভব নয়, তবে স্মৃতিতে সময়কে দীর্ঘ করা যায়। এজন্য নিয়মিত স্মৃতি ধরে রাখা জরুরি। ডায়েরি লেখা, পুরোনো ছবি দেখা বা আগের ঘটনাগুলো মনে করা এতে সহায়ক। পাশাপাশি নতুন অভিজ্ঞতা তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ। ভ্রমণ করা, নতুন কিছু শেখা, ভিন্ন পরিবেশে সময় কাটানো—এগুলো স্মৃতিকে সমৃদ্ধ করে। তখন বছর শেষ হলেও মনে হবে না যে পুরো সময়টা চোখের পলকে উড়ে গেছে।
সিএ/এমআর


