রমজান মাস শুধু সিয়াম সাধনার সময় নয়, এটি আত্মশুদ্ধি, মানবিকতা ও সহমর্মিতার অনুশীলনের এক বিশেষ সময়। ইসলামের ইতিহাস ও হাদিসের বর্ণনায় রমজানকে ‘সহমর্মিতার মাস’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। কারণ রোজা মানুষকে ক্ষুধা ও তৃষ্ণার অভিজ্ঞতার মাধ্যমে অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায়।
রোজার মাধ্যমে একজন মানুষ নিজের চাহিদাকে সংযত করতে শেখে এবং অভাবগ্রস্ত মানুষের দুঃখকষ্ট অনুধাবনের সুযোগ পায়। এ কারণে রমজান শুধু ইবাদতের সময় নয়; বরং এটি মানবিক দায়িত্ববোধ জাগ্রত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবেও বিবেচিত হয়।
ইসলামে সহমর্মিতা শুধু দান করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং অন্যের প্রয়োজন উপলব্ধি করে তাকে অগ্রাধিকার দেওয়ার মধ্যেই এর প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত রয়েছে। ইসলামের ভাষায় এই চেতনাকে বলা হয় ‘ইসার’—নিজের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যকে প্রাধান্য দেওয়া।
কোরআনে আনসারদের প্রশংসা করে বলা হয়েছে, তারা নিজেদের প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও অন্যদের অগ্রাধিকার দিতেন। এই মানসিকতা রমজানের সময় বিশেষভাবে অনুশীলন করা উচিত বলে উল্লেখ করেছেন ইসলামি চিন্তাবিদরা।
ইসলামের প্রাথমিক যুগের অনেক মনীষীর জীবনেও এই সহমর্মিতার দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। ইবনে ওমর (রা.) রোজা রাখার পর কোনো মিসকিন ছাড়া ইফতার করতেন না। তিনি মনে করতেন, দরিদ্র মানুষের সঙ্গে ইফতার ভাগাভাগি করাই প্রকৃত তৃপ্তির অংশ।
ইমাম আহমাদ (রহ.)-এর জীবনে এমন একটি ঘটনা উল্লেখ করা হয় যেখানে এক ভিক্ষুকের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তিনি নিজের ইফতারের জন্য রাখা দুটি রুটিই দান করে দেন এবং নিজে অনাহারে রাত কাটান। এসব উদাহরণ মুসলিম সমাজে আত্মত্যাগ ও উদারতার শিক্ষাকে তুলে ধরে।
হাসান বসরি (রহ.) নফল রোজা রেখে নিজের পরিবর্তে অন্যদের আহার করাতেন এবং পাশে বসে তাদের সেবা করতেন। একইভাবে ইবনে মুবারক (রহ.) সফরের সময় সঙ্গীদের বিভিন্ন খাবার খাওয়াতেন, যদিও তিনি নিজে রোজা রাখতেন।
রমজানে দান-সদকার গুরুত্বও বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এ সময় প্রতিটি নেক আমলের সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ফলে দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানো, জাকাত ও সদকা প্রদান এবং ইফতার ভাগাভাগি করার মতো কাজ সমাজে পারস্পরিক ভালোবাসা ও সংহতি বাড়াতে সহায়তা করে।
এই সহমর্মিতার চেতনা ব্যক্তি থেকে পরিবার, পরিবার থেকে সমাজ এবং সমাজ থেকে বৃহত্তর জাতির মধ্যে ছড়িয়ে পড়তে পারে। একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার সদস্যরা একে অপরের দুঃখকষ্টে পাশে দাঁড়ায়।
সিএ/এমআর


