ইসলামের ইতিহাসে কিছু মনীষী আছে, যাদের জীবন মূলমন্ত্র হলো জ্ঞান, আমল এবং আখলাক—এই তিনের সুষম সমন্বয়। তাদের মধ্যে ইমাম আবু হানিফা নুমান ইবনু সাবিত রহ. অন্যতম।
তিনি শুধু একজন ফকিহ বা মুজতাহিদ ইমামই ছিলেন না; বরং মানবিক গুণাবলির জীবন্ত প্রতীক। তাঁর জীবন কোরআন ও সুন্নাহর বাস্তব প্রতিফলন, যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের মেলবন্ধন স্পষ্ট।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর কবর বা মাজার ইরাকের বাগদাদ শহরের আল-আদামিয়াতে অবস্থিত।
সংক্ষিপ্ত পরিচয়
ইমাম আবু হানিফা রহ. ৮০ হিজরীতে কুফায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৫০ হিজরীতে বাগদাদে ইন্তিকাল করেন। তিনি তাবেইন যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আলেম ছিলেন এবং বহু সাহাবির সাক্ষাৎ লাভ করেছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত হানাফি মাজহাব আজ বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তৃত অনুসৃত মাজহাব।
তাকওয়া ও আল্লাহভীতি
ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন অত্যন্ত তাকওয়াশীল। তিনি হারাম ও সন্দেহজনক কাজ থেকে দূরে থাকতেন এবং বৈধ ব্যবসায়ও অতিরিক্ত সতর্ক থাকতেন। তার সতর্কতা ও আল্লাহভীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে তিনি বলেন, দুনিয়ার উদ্দেশ্যে অর্জিত ইলম কখনো সফলতা আনে না।
ইবাদতে গভীরতা
ইমাম আবু হানিফা রহ. দীর্ঘ কিয়ামুল লাইল আদায় করতেন। অনেক বছর তিনি ইশা ও ফজরের নামাজ একই অজুতে আদায় করেছেন। রাতে কোরআনের আয়াত পড়ে তিনি কাঁদতেন এবং ফজর পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকতেন।
বিনয় ও নম্রতা
যদিও তিনি জ্ঞান ও মর্যাদায় মহান, তথাপি ছিলেন অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র। তিনি নিজের মতকে কখনো চূড়ান্ত মনে করতেন না এবং বলতেন:
هذا رأيي وهو أحسن ما قدرنا عليه، فمن جاءنا بأحسن منه قبلناه
“এটি আমার মত, যা আমার সাধ্যানুযায়ী সর্বোত্তম। কেউ যদি এর চেয়ে উত্তম কিছু নিয়ে আসে, আমরা তা গ্রহণ করব।”
মানুষের সঙ্গে আচরণ
ইমাম আবু হানিফা রহ. মানুষের সাথে কোমল ও সৌজন্যমূলক আচরণ করতেন, এমনকি তার বিরোধীদের সাথেও। এক ব্যক্তি তাকে প্রকাশ্যে অপমান করলেও তিনি ধৈর্য ধারণ করতেন এবং পরে সেই ব্যক্তির খোঁজখবর নিতেন।
ন্যায় ও সত্যের প্রতি আপসহীনতা
তিনি অন্যায়ের সঙ্গে কখনো আপস করেননি। আব্বাসিয় খলিফা তাকে বিচারপতির পদ দিতে চাইলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, কারণ এতে সত্য কথা বলার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে পারত। ফলে তাকে কারাবরণ ও নির্যাতনের সম্মুখীন হতে হয়।
দানশীলতা ও মানবিকতা
ইমাম আবু হানিফা রহ. ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। তিনি ছাত্রদের ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিতেন এবং কাউকে অপমান না করে সাহায্য করতেন।
ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর জীবন আমাদের জন্য এক পূর্ণাঙ্গ আদর্শ। এখানে ইলম আছে, কিন্তু অহংকার নেই; তাকওয়া আছে, কিন্তু রিয়াকারি নেই; ইবাদত আছে, কিন্তু গোঁড়া রীতিবোধ নয়; এবং চরিত্র আছে, যা কোরআন ও সুন্নাহর জীবন্ত ব্যাখ্যা।
আজকের সমাজে যেখানে জ্ঞান ও চরিত্রের মধ্যে বিচ্ছেদ দেখা যাচ্ছে, সেখানে ইমাম আবু হানিফা রহ. আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন: উত্তম চরিত্র ছাড়া প্রকৃত ইলম পূর্ণতা পায় না।
নিশ্চয়ই রসুলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“আমি প্রেরিত হয়েছি উত্তম চরিত্র পূর্ণতা দান করার জন্য।” (মুসনাদে আহমাদ: ৮৯৫২)


