মসজিদে নববী কেবল একটি স্থাপনা নয়; এটি নবুয়তের ইতিহাসের একটি জীবন্ত আর্কাইভ। প্রতিটি স্থান ইবাদত, কষ্ট, তওবা এবং নবীজির (সা.) জীবনচর্চার নীরব সাক্ষী। মসজিদে প্রবেশ করলে বোঝা যায়—ইট-পাথরের চেয়ে স্মৃতির ওজন অনেক ভারী।
মসজিদে নববীর সম্মুখ অংশে ৮টি ঐতিহাসিক স্তম্ভ (উস্তুওয়ানাহ) রয়েছে, যেগুলোতে নবী (সা.)–এর যুগে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। স্তম্ভগুলো কেবল পাথরের জন্য নয়; এগুলো যা দেখেছে, যা বহন করেছে, সেটাই তাদের গুরুত্ব।
১. উস্তুওয়ানাহ হান্নানাহ (কান্নার স্তম্ভ)
নবী (সা.) এখানে সালাত আদায় করতেন। একসময় এখানে একটি খেজুর গাছ ছিল, যেটিতে ভর দিয়ে তিনি খুতবা দিতেন। মিম্বর স্থাপনের পর গাছটি কান্নার মতো শব্দে কেঁদে উঠলে নবী (সা.) নিজে শান্ত করেন। পরে গাছটি শুকিয়ে গেলে সম্মানের সঙ্গে দাফন করা হয়।
২. উস্তুওয়ানাহ সারীর (বিশ্রামের স্থান)
ইতিকাফের সময় নবী (সা.) এখানে বিশ্রাম নিতেন। এখানে কাঠের একটি ছোট মাচা রাখা হতো। ইবাদতের মাঝেও পরিমিত বিশ্রাম নেওয়া ছিল সুন্নাহ।
৩. উস্তুওয়ানাহ তাওবা
সাহাবি আবু লুবাবাহ (রা.) এক অনিচ্ছাকৃত ভুলের পর নিজেকে একটি খেজুর গাছের সঙ্গে বেঁধে বলেন—‘আল্লাহ আমার তওবা কবুল না করা পর্যন্ত আমি মুক্ত হবো না।’ দীর্ঘ কষ্টের পর তাহাজ্জুদের সময় তার তওবা কবুল হয়। নবী (সা.) নিজ হাতে তাকে মুক্ত করেন।
৪. উস্তুওয়ানাহ আয়েশা (রা.)
নবী (সা.) এখানে সালাত আদায় করতেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, মসজিদে এমন একটি স্থান আছে, যার ফজিলত মানুষ জানলে সেখানে নামাজ পড়তে কুর‘আ করতে হতো। হজরত আবু বকর ও ওমর (রা.) নিয়মিত এখানে নামাজ আদায় করতেন।
৫. উস্তুওয়ানাহ আলী (রা.)
‘মাহরাস’ অর্থ—পাহারা। এই স্তম্ভের পাশে সাহাবারা নবী (সা.)–এর নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতেন। হজরত আলী (রা.) এই দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি পালন করেছিলেন।
৬. উস্তুওয়ানাহ উফূদ
‘উফূদ’ অর্থ—প্রতিনিধি দল। বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধি দল এখানে বসত। নবী (সা.) তাদের সঙ্গে আলোচনা করতেন, ইসলামের দাওয়াত দিতেন এবং প্রশ্নের উত্তর দিতেন।
৭. উস্তুওয়ানাহ জিবরাঈল (আ.)
এই পথ দিয়েই হজরত জিবরিল (আ.) নবী (সা.)–এর কাছে আসতেন। বর্তমান সময় এটি রওজা শরিফের ভেতরে হলেও ঐতিহাসিক অবস্থান সুপ্রতিষ্ঠিত।
৮. উস্তুওয়ানাহ তাহাজ্জুদ
রাত গভীর হলে নবী (সা.) এখানে চাটাই বিছিয়ে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করতেন। বর্তমানে এটি বুকশেলফ দিয়ে আচ্ছাদিত, তবে পুরোনো নথি ও ছবিতে অবস্থান স্পষ্ট।
মসজিদে নববী নবুয়তের জীবন্ত মানচিত্র। এখানে গেলে শুধু ছবি তুলবেন না; থেমে একটু নীরবে শুনুন। স্তম্ভগুলো কথা বলে, শুধু শোনার মতো মন দরকার। আল্লাহ আমাদের উপলব্দি করার তৌফিক দান করুন। আমিন।
সিএ/এসএ


