দক্ষিণ আফ্রিকার উপকূলীয় অঞ্চলে এমন অদ্ভুত পাথুরে কাঠামো লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রাকৃতিক পরিবেশের চরম প্রতিকূলতার মধ্যেও দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পরিবেশ থেকে কার্বন শোষণ করছে। এই কাঠামোগুলোকে ‘মাইক্রোবায়ালাইট’ নামে পরিচিত। দেখতে সাধারণ পাথরের মতো হলেও এগুলো সম্পূর্ণ জীবন্ত; অসংখ্য ক্ষুদ্র অণুজীব একত্রিত হয়ে এই গঠন তৈরি করেছে।
মাইক্রোবায়ালাইট স্তরে স্তরে সাজানো কাঠামোর মাধ্যমে প্রাচীনতম বাস্তুতন্ত্রের সঙ্গে মিল রেখেছে। সম্প্রতি ‘বিগেলো ল্যাবরেটরি ফর ওশান সায়েন্সেস’ এবং ‘রোডস ইউনিভার্সিটি’র যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় এসব মাইক্রোবায়ালাইট শুধু প্রতিকূল পরিবেশে বাঁচে না, বরং অত্যন্ত দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পরিবেশ থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন শোষণ করে, যা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটে রূপান্তরিত হয়ে স্থায়ীভাবে পাথরের মধ্যে জমা হয়।
মাইক্রোবায়ালাইট গঠনের এই প্রক্রিয়ায় অণুজীব পানির মধ্যে দ্রবীভূত কার্বন শোষণ করে এবং তা ক্যালসিয়াম কার্বোনেটে রূপান্তরিত করে। ক্যালসিয়াম কার্বোনেটই চুনাপাথর ও প্রবাল প্রাচীরের মূল উপাদান। এই ধাপে ধাপে জমা হওয়া কাঠামো হাজার হাজার বা কোটি কোটি বছর টিকে থাকতে পারে।
গবেষকরা বলছেন, জীবাশ্ম হয়ে যাওয়া মাইক্রোবায়ালাইট পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্বের প্রাচীনতম প্রমাণের মধ্যে অন্যতম। প্রায় তিনশ কোটি বছরের পুরনো এই কাঠামো দীর্ঘদিন ধরে ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে বলে ধারণা করা হতো। তবে নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার চারটি সক্রিয় মাইক্রোবায়ালাইট প্রতি বছর দৈর্ঘ্যে প্রায় দুই ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
‘বিগেলো ল্যাবরেটরি’র সিনিয়র রিসার্চার র্যাচেল সিপলার বলেন, পাঠ্যবইতে এসব গঠনকে প্রায় বিলুপ্ত হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু আমরা এমন প্রাণবন্ত অণুজীব খুঁজে পেয়েছি, যা চরম ও পরিবর্তনশীল পরিবেশেও দ্রুত বৃদ্ধি পায়।
গবেষণা অনুযায়ী, মাইক্রোবায়ালাইট উপকূলীয় বালিয়াড়ি থেকে ক্যালসিয়াম সমৃদ্ধ পানি শুষে নেয়। এই পরিবেশ খুবই চরম; কখনো শুকনো, কখনো পানিতে তলিয়ে যায়। তাপমাত্রা, সূর্যের আলো ও পানির রাসায়নিক উপাদান সবসময় পরিবর্তিত হলেও অণুজীব নিজেকে মানিয়ে নেয়।
দৈনিক কার্বন শোষণের ক্ষেত্রে এদের সক্রিয়তা বিস্ময়কর। দিনের বেলা উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ হয়। গবেষকরা দেখেছেন, রাতেও এদের শোষণ হার প্রায় একই থাকে। রাতের সক্রিয়তা গভীর সমুদ্রের তলদেশের ‘হাইড্রোথার্মাল ভেন্ট’-এর আশপাশে থাকা প্রাণীদের মতো রাসায়নিক প্রক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে।
দৈনিক হিসাব অনুযায়ী, প্রতি বর্গমিটার মাইক্রোবায়ালাইট বছরে প্রায় ৯ থেকে ১৬ কেজি কার্বন শোষণ করতে পারে। বৃহৎ এলাকা হিসেবে ধরলে একটি টেনিস কোর্টের সমান মাইক্রোবায়ালাইট এলাকা প্রতি বছর কয়েক একর বন সমান কার্বন ধরে রাখতে সক্ষম।
গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মাইক্রোবায়ালাইট কার্বনকে সরাসরি স্থায়ী খনিজ পাথরে রূপান্তরিত করে, যা দীর্ঘমেয়াদী কার্বন সঞ্চয়ের জন্য কার্যকর। এবারই প্রথম গবেষকরা কার্বন শোষণের হার এবং অণুজীব সম্প্রদায়ের জেনেটিক গঠনের সম্পর্ক পরীক্ষা করেছেন। এ সম্পর্ক দেখিয়েছে, কেন কিছু মাইক্রোবায়ালাইট দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং বিভিন্ন অণুজীব কীভাবে কার্বনের ভবিষ্যৎ গঠনে ভূমিকা রাখে।
সিএ/এমআর


