সম্পর্ক, বন্ধুত্ব ও আন্তঃসম্পর্ক মানুষের জীবনের মান ও দীর্ঘায়ু বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যও এগুলো অপরিহার্য। তবে দায়িত্বহীনতা, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ এবং অযথা দূরত্ব তৈরি করার প্রবণতার কারণে অনেক বন্ধুত্ব ভেঙে যাচ্ছে, যার ফল হিসেবে সমাজে একাকিত্বের প্রবণতা বাড়ছে।
২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের গ্যালপ জরিপে প্রতি পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্কের একজন জানিয়েছেন, আগের দিন তারা বেশিরভাগ সময় একাকিত্ব অনুভব করেছেন। অথচ গবেষণায় দেখা যায়, ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক মানসিক চাপ কমায়, আনন্দ বাড়ায় এবং দীর্ঘায়ুতে সহায়তা করে। তবু সেই সম্পর্ক রক্ষায় যত্ন ও দায়িত্ববোধ অনেকের মধ্যেই কমে যাচ্ছে।
বিয়ে, হাউজ-ওয়ার্মিং, নববর্ষ বা জন্মদিনের মতো অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত বন্ধুরা উপস্থিত না হলে আয়োজনকারীরা মানসিক কষ্ট অনুভব করেন। অনেকেই আগেই সম্মতি জানিয়ে শেষ মুহূর্তে তুচ্ছ কারণে বাতিল করেন, যা বন্ধুত্বে হতাশা তৈরি করে।
শিকাগো-ভিত্তিক আলোকচিত্রী র্যাচেল লাভলি সিএনএন ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “সবাই চায় একটি শক্তিশালী সামাজিক পরিমণ্ডল বা ‘ভিলেজ’। তবে খুব কম মানুষই ‘ভিলেজার’য়ের ভূমিকা নিতে চায়।” তার মতে, একসময় অসুস্থ বন্ধুকে খাবার দিয়ে আসা, কারও জন্য ডাক সংগ্রহ করা বা বিমানবন্দরে পৌঁছে দেওয়া সামাজিক জীবনের স্বাভাবিক অংশ ছিল, যা এখন কমে যাচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নারী-সম্পর্ক-বিষয়ক স্বাস্থ্যশিক্ষক ড্যানিয়েল বায়ার্ড জ্যাকসন বলেন, “অবশ্যই কর্তব্য, দায়িত্ব, প্রতিশ্রুতি, অসুবিধা কিংবা সময় দেওয়া— এসব শব্দ হয়ত খুব আকর্ষণীয় শোনায় না। তবে এগুলো ছাড়া গভীর ও সুস্থ সম্পর্ক তৈরি সম্ভব নয়।” একই প্রতিবেদনে ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ডের মনোবিজ্ঞানী ডা. মারিসা জি. ফ্রাঙ্কো বলেন, “বন্ধুর অনুষ্ঠানে উপস্থিত না হওয়ার বৈধ কারণ হতে পারে জরুরি অবস্থা বা বিশেষ পরিস্থিতি। তবে শুধুমাত্র মন খারাপ কিংবা সামান্য অজুহাত কোনো বৈধ কারণ নয়।”
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো অনুষ্ঠানে সম্মতি দেওয়ার আগে নিজের সময় ও সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি। যদি আগে থেকেই জানা থাকে যে কর্মব্যস্ততার কারণে যাওয়া সম্ভব হবে না, তবে শুরুতেই না বলা ভালো। শেষ মুহূর্তে বাতিল করা বন্ধুত্বে আঘাত হানে। পাশাপাশি সময় ব্যবস্থাপনার অভাব, ডাবল-বুকিং বা সবসময় ব্যক্তিগত অনুভূতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতাও অনেক সম্পর্কের ক্ষতি করছে।
বন্ধুর বাসা বদলানো বা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সহযোগিতা করা কষ্টকর মনে হলেও, ড্যানিয়েল বায়ার্ড জ্যাকসনের ভাষায়, “এটি কেবল শারীরিক শ্রম নয়, বরং একসঙ্গে নতুন অধ্যায়ের সূচনাকে ভাগ করে নেওয়া। এতে সম্পর্ক আরও মজবুত হয়।” গবেষণায় দেখা যায়, অন্যকে সাহায্য করার মাধ্যমে মানুষ নিজের মধ্যেও তৃপ্তি, আত্মসম্মান ও জীবনের উদ্দেশ্য খুঁজে পায়, যা দীর্ঘায়ুর সঙ্গেও সম্পর্কিত।
অনুষ্ঠানে যেতে না পারলে বিষয়টি হালকাভাবে এড়িয়ে না গিয়ে সৎভাবে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেন ডা. ফ্রাঙ্কো। এতে বন্ধুরা বুঝতে পারে যে তাদের অনুভূতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সীমারেখা বা বাউন্ডারি নির্ধারণ জরুরি হলেও সবসময় নিজের সুবিধাকে অগ্রাধিকার দেওয়া সীমারেখা নয়, বরং তা স্বার্থপরতার শামিল।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সঠিক সময়ে প্রতিশ্রুতি দেওয়া ও তা রক্ষা করা, প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো, সৎভাবে মতামত জানানো এবং আত্মকেন্দ্রিকতা ও সীমারেখার পার্থক্য বোঝার ওপর গুরুত্ব দেন বিশেষজ্ঞরা।
সিএ/এমআর


