দাম্পত্য জীবনের কয়েক বছর পার না হতেই স্বামী বা স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্কের প্রতি আগ্রহ কমে যাওয়ার ঘটনা নতুন কিছু নয়। অনেক দম্পতির ক্ষেত্রেই সময়ের সঙ্গে এই পরিবর্তন দেখা যায়, যা সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এক নারী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, তার স্বামীর সঙ্গে ছয় মাসের বেশি সময় ধরে কোনো শারীরিক সম্পর্ক নেই। প্রথম তিন বছর ভালো কাটলেও এখন পরিস্থিতি বদলে গেছে। তিনি চিন্তিত হলেও স্বামী এ বিষয়ে উদাসীন। এমন অবস্থায় অনেকে লজ্জা বা দ্বিধার কারণে কারও কাছে পরামর্শ নিতে চান না।
এ ধরনের ঘটনার প্রেক্ষাপটে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইন্সটিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা রহমান দিনা এই সমস্যার সম্ভাব্য কারণ ও করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করেন।
চিকিৎসাবিজ্ঞানে যৌন ইচ্ছা কমে যাওয়াকে লস অফ লিবিডো বলা হয়। বিশ্বে প্রতি পাঁচজন পুরুষের একজন এবং নারীদের মধ্যে আরও বেশি মানুষ এ সমস্যায় ভোগেন। এর পেছনে একাধিক শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক কারণ থাকতে পারে।
শারীরিক ও চিকিৎসাগত কারণ হিসেবে বয়স বাড়ার সঙ্গে পুরুষের শরীরে টেস্টোস্টেরন হরমোনের মাত্রা কমে যাওয়া উল্লেখযোগ্য। অন্য রোগের কারণেও এই হরমোন কমতে পারে, যা যৌন আকাঙ্ক্ষা হ্রাস করে। নারীদের ক্ষেত্রে রজঃনিবৃত্তির আগে ইস্ট্রোজেন ও প্রজেস্টেরন হরমোন কমে গেলে যোনিপথ শুষ্ক হয়ে যৌনতায় অনীহা তৈরি হতে পারে। জরায়ু বা ডিম্বাশয় অপসারণের পরেও একই সমস্যা দেখা দিতে পারে। থাইরয়েডের ঘাটতি বা প্রলেকটিন হরমোন বেড়ে গেলেও যৌন ইচ্ছায় প্রভাব পড়ে। ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, স্থূলতা ও লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগের জটিলতাও এই সমস্যার সঙ্গে জড়িত। পাশাপাশি অনিদ্রা বা অতিরিক্ত ক্লান্তি নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই যৌন আগ্রহ কমিয়ে দিতে পারে।
মানসিক কারণের মধ্যে রয়েছে মানসিক চাপ, উদ্বেগ ও বিষণ্নতা, যা যৌনতায় অনীহা সৃষ্টি করে। অতীতে যৌন হয়রানির শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে এই সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে। আত্মবিশ্বাসের অভাব বা নিজের শরীর নিয়ে অস্বস্তি, বিশেষ করে সন্তান জন্মের পর নারীদের ক্ষেত্রে, আগ্রহ কমিয়ে দেয়। পিটিএসডি বা ওসিডির মতো মানসিক রোগও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে।
সম্পর্কজনিত কারণও গুরুত্বপূর্ণ। দাম্পত্য কলহ বা অমীমাংসিত ঝগড়া মানসিক দূরত্ব তৈরি করে, যা শারীরিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলে। সঙ্গীর প্রতি বোঝে না ধরনের মনোভাব তৈরি হলে আগ্রহ আরও কমে যেতে পারে। যৌন চাহিদা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব, একঘেয়েমি বা নতুনত্বের অভাবও আগ্রহ হ্রাসের কারণ হতে পারে। বিশ্বাসঘাতকতা বা বিশ্বাসের অভাব সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতাকে আরও দুর্বল করে।
জীবনযাপনের দিক থেকেও বিষয়টি প্রভাবিত হয়। অফিসের অতিরিক্ত চাপ ও বিশ্রামের অভাব যৌনতায় উদাসীনতা আনে। অ্যালকোহল, নেশাদ্রব্য বা কিছু ওষুধ যৌন ইচ্ছা কমিয়ে দিতে পারে। অপুষ্টিকর খাবার ও শরীরচর্চার অভাবও দায়ী। নারীদের ক্ষেত্রে সন্তান লালন-পালনের চাপ শারীরিক ও মানসিক শক্তি কমিয়ে দেয়, যা আগ্রহের ওপর প্রভাব ফেলে।
করণীয় হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, নিজেকে দোষারোপ করা যাবে না এবং সঙ্গীর সঙ্গে অনুভূতির কথা খোলামেলা বলতে হবে, তবে জোর করা ঠিক নয়। ক্লান্তি কাটাতে একে অপরকে সাহায্য করা এবং কাজ ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন। নেশাদ্রব্য থেকে দূরে থাকা, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। সম্পর্কে নতুনত্ব আনতে একসঙ্গে সময় কাটানো ও ঘুরে বেড়ানো উপকারী হতে পারে। কম বয়সে এই সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত, কারণ নির্ণয় করে চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং নিলে উপকার পাওয়া যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যৌন অনীহা সম্পর্কের স্বাভাবিক অংশ নয়, তবে এটি সমাধানযোগ্য। খোলামেলা আলোচনা ও পেশাদারের সহায়তা নিয়ে এ সমস্যা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। সুস্থ সম্পর্কের জন্য শারীরিক ও মানসিক সামঞ্জস্য দুটোই জরুরি।
সিএ/এমআর


