পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তে মানুষ থাকুক, ভাষা বা সংস্কৃতি যাই হোক না কেন, সময়ের প্রতি অভিজ্ঞতা সর্বত্র মিলনীয়। সকাল হলেই সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় অস্ত যায়।
এই নিয়মিত ঘূর্ণনই মানুষকে প্রথম বার বুঝিয়েছে সময়ের ধারাবাহিকতা। সূর্যের যাত্রা এবং চাঁদের পরিবর্তন মানুষকে দিন, মাস এবং বছরের ধারণা শিখিয়েছে—যার ফলস্বরূপ জন্ম নিয়েছে ক্যালেন্ডার।
প্রাচীনকাল থেকে ক্যালেন্ডারের বিবর্তন বহুবার ঘটেছে। আজকের আধুনিক ক্যালেন্ডারের পেছনে রয়েছে হাজার বছরের আকাশ পর্যবেক্ষণ, প্রকৃতি বোঝার চেষ্টার ইতিহাস। মানুষ কেবল আকাশ দেখে দিন গোনেনি, বরং ঋতু, ফসল, শিকার, উৎসব—সবকিছু নির্ধারণ করেছিল এই পর্যবেক্ষণ।
প্রাচীন কালের আকাশভিত্তিক ক্যালেন্ডার

মানুষ প্রথমে সূর্য, চাঁদ ও তারার নড়াচড়ার মাধ্যমে সময় বুঝতে শিখেছিল। চাঁদের মাসিক চক্র এবং সূর্যের ৩৬৫ দিনের পথ মানুষকে বছর গণনার ধারণা দিয়েছে। প্রাচীন শিকারি–সংগ্রাহকেরা চাঁদ দেখে দিন গণনা করতেন, সূর্য দেখে ঋতু বুঝতেন। স্টোনহেঞ্জ বা স্কটল্যান্ডের ওয়ারেন ফিল্ডে পাওয়া প্রমাণ দেখায়, মানুষ নিয়মিত দিন গোনার চেষ্টা করেছিল।
ব্যাবিলনীয় ক্যালেন্ডার

টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের ভিন্ন শহরগুলোতে খ্রিস্টপূর্ব ৩৮০০ সালে কাদামাটিতে খোদাই করা কিউনিফর্মে মাস ও বছরের হিসাব রাখা হতো। ব্যাবিলনীয় ক্যালেন্ডার তৈরি হয় একক নিয়মে, যেখানে ১২ মাস, প্রতি চার বছরে একটি বাড়তি মাস এবং সপ্তম দিনে বিশ্রাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। এতে কৃষি, ধর্ম এবং প্রশাসন মিলে সময় নির্ধারণ করা হতো।
মিশরীয় ক্যালেন্ডার

নীল নদীর বন্যার ছন্দে মিশরীয়রা বছর ভাগ করেছিল তিন মৌসুমে। পরে নাগরিক প্রশাসনের সুবিধার্থে ১২ মাস, প্রতি মাস ৩০ দিন, সঙ্গে ৫ অতিরিক্ত দিন যুক্ত করে ৩৬৫ দিনের বছর তৈরি করা হয়। লিপ ইয়ার ছাড়া ছোটখাটো ত্রুটি থাকলেও সিরিয়াস তারার পুনরাবৃত্তি মিলে সময়ের হিসাব আরও নিখুঁত হয়।
রোমান ও জুলিয়ান ক্যালেন্ডার
প্রথম রোমান ক্যালেন্ডার চাঁদভিত্তিক, তবে বছরগুলো অস্থিতিশীল ছিল। জুলিয়াস সিজারের যুগে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৮) ৪৪৫ দিনের ‘বিভ্রান্তি বছর’ দিয়ে বছরের দৈর্ঘ্য স্থির করা হয় এবং লিপ ডে নিয়ম চালু করা হয়। মাসের নাম, দিনের সংখ্যা ও ছুটি—সব কিছু নির্ধারিত হয়। ক্যালেন্ডার রোমে শুধু সময় গণনার মাধ্যম ছিল না, এটি হয়ে উঠেছিল রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তির হাতিয়ার।
গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সামান্য ১১ মিনিটের ত্রুটি সময়ের সঙ্গে ঋতু মিলাতে বাধা দিচ্ছিল। ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি এই ভুল সংশোধন করে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার চালু করেন। লিপ ইয়ারের নিয়ম বদলানো হয়—চার বছরের লিপ ইয়ার, শতাব্দীর লিপ ইয়ার বাতিল, যদি না ৪০০ দ্বারা ভাগ যায়। এতে সময় প্রকৃত সৌর বছরের সঙ্গে মিলে যায়।
পাথরের বৃত্ত থেকে স্মার্টফোনের ক্যালেন্ডার

মানুষের সময় গণনার গল্প শুরু হয়েছিল আকাশের দিকে তাকিয়ে। ধীর-স্থির হিসাব থেকে জন্ম নেয় লিখিত ক্যালেন্ডার। প্রাচীন মিশর, ব্যাবিলন, রোম—সব মিলিয়ে শতাব্দী প্রজন্ম ধরে ক্যালেন্ডার আরও নিখুঁত হয়ে উঠেছে। আজ আমরা মোবাইল বা কম্পিউটারে তারিখ ও সময় দেখি, তবে ইতিহাসে পাথরের ছায়া থেকে ডিজিটাল ক্যালেন্ডার—সময়ের সঙ্গে মানুষের সহাবস্থানের গল্প এখনও চলমান।
সিএ/এসএ


