নির্বাচনী হলফনামায় নিজের আয় ও সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিভ্রান্তি ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে তিনি এ অভিযোগ করেন। একই সঙ্গে ওই পোস্টে নিজের আয়, সম্পদ, ব্যাংক হিসাব ও পেশা সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেন তিনি।
ফেসবুক পোস্টে নাহিদ ইসলাম বলেন, তার নির্বাচনী হলফনামায় উল্লেখিত আয় ও সম্পদ নিয়ে যে আলোচনা চলছে, তা বাস্তব তথ্যের বিকৃতি। এই অপপ্রচার সত্য উদঘাটনের চেয়ে বরং একজন স্বচ্ছ রাজনীতিবিদকে সন্দেহের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর একটি রাজনৈতিক প্রয়াস বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বাৎসরিক আয় নিয়ে ছড়ানো বিভ্রান্তির ব্যাখ্যায় নাহিদ ইসলাম বলেন, হলফনামায় উল্লেখ করা ১৬ লাখ টাকা কোনো নির্দিষ্ট চাকরি ছাড়ার পর হঠাৎ অর্জিত অর্থ নয়। এটি ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরের মোট আয়ের হিসাব, যা ১ জুলাই থেকে পরবর্তী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময়কে অন্তর্ভুক্ত করে। এই সময়ের বড় একটি অংশে, প্রায় সাত মাস, তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে নির্ধারিত বেতন-ভাতা পেয়েছেন।
তিনি জানান, এই ১৬ লাখ টাকার মধ্যে প্রায় ১১ লাখ টাকা উপদেষ্টা হিসেবে প্রাপ্ত বেতন-ভাতা, যা ব্যাংক চ্যানেলের মাধ্যমে পরিশোধিত, আয়করযোগ্য এবং সম্পূর্ণ নথিভুক্ত। বাকি অংশ এসেছে উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কনসালটেন্ট হিসেবে বৈধ পেশাগত কাজের সম্মানী থেকে, যারও সুস্পষ্ট কর হিসাব রয়েছে।
মোট সম্পদ প্রসঙ্গে নাহিদ ইসলাম বলেন, হলফনামায় তার মোট সম্পদ ৩২ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কোনো এক বছরের আয় নয়, বরং প্রায় ২৭ বছরের জীবনের সঞ্চয়ের সমষ্টি। এর মধ্যে রয়েছে উপদেষ্টা পদের বেতন থেকে সেভিংস, পূর্ববর্তী সঞ্চয়, পারিবারিক ও সামাজিক অনুষ্ঠানে পাওয়া উপহার, স্বর্ণালংকার, ফার্নিচার এবং ইলেকট্রনিক পণ্যের মূল্য। পাশাপাশি উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের পর আয়কর পরিশোধিত আয়ের অংশও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এখানে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তা সম্পূর্ণ সত্য ও নির্ভুল বলেও তিনি দাবি করেন।
ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নিয়ে চলমান আলোচনার বিষয়ে নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি তথ্যের অপব্যবহার ছাড়া কিছু নয়। উপদেষ্টা পদ থেকে পদত্যাগের সময় তার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১০ হাজার টাকা ছিল, যা উপদেষ্টা থাকাকালীন মোট আয়ের পর অবশিষ্ট নগদ অর্থ—তার মোট সম্পদের প্রতিফলন নয়। পরে সরকারিভাবে মন্ত্রীদের আসবাবপত্র ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ অর্থ একই অ্যাকাউন্টে জমা হওয়ায় ব্যালেন্স বৃদ্ধি পায়, যা হলফনামায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। বর্তমানে তার দুটি ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে—একটি সোনালী ব্যাংকে এবং আরেকটি নির্বাচনী ব্যয় নির্বাহের জন্য ২৮ ডিসেম্বর সিটি ব্যাংকে খোলা। এর বাইরে তার আর কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে তিনি স্পষ্ট করেন, উপদেষ্টা পদে থাকা অবস্থায় যেমন তার কোনো জমি, ফ্ল্যাট বা গাড়ি ছিল না, পদত্যাগের পরেও তেমন কোনো সম্পদ অর্জন করেননি।
পেশা সংক্রান্ত বিভ্রান্তির বিষয়েও ফেসবুক পোস্টে ব্যাখ্যা দেন নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, হলফনামার কোথাও তার পেশা হিসেবে শিক্ষকতা উল্লেখ করা হয়নি। তার পূর্ববর্তী পেশা ছিল সরকারের উপদেষ্টা এবং বর্তমান পেশা হিসেবে কনসালট্যান্সি উল্লেখ রয়েছে, যা একটি স্বীকৃত ও বৈধ পেশা। তিনি একটি টেক ফার্মে স্ট্র্যাটেজিক ও পলিসি সিদ্ধান্তে পরামর্শ দেন, যে প্রতিষ্ঠানের নাম নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা নথিতেই উল্লেখ আছে। ওই প্রতিষ্ঠান কোনো সরকারি প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত নয় এবং তার সম্পৃক্ততার কারণে কখনোই কোনো সরকারি সুবিধা পায়নি বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পোস্টের শেষাংশে নাহিদ ইসলাম বলেন, তার আয় ও সম্পদ সংক্রান্ত প্রতিটি তথ্য আয়কর রিটার্ন ও নির্বাচনী হলফনামার মাধ্যমে আইনগতভাবে যাচাইযোগ্য। উপদেষ্টা থাকাকালীন আয়, পদত্যাগের পর পেশাগত আয় এবং জীবনের সামগ্রিক সম্পদ—সবকিছু আলাদা করে স্বচ্ছভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। অথচ এই স্পষ্ট তথ্যগুলোকে ইচ্ছাকৃতভাবে গুলিয়ে একটি অসৎ রাজনৈতিক বয়ান তৈরির চেষ্টা চলছে। তার দাবি, সীমিত সম্পদ ও স্বচ্ছ আয়ের ঘোষণা প্রমাণ করে তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার বা অবৈধ সম্পদ সঞ্চয়ের রাজনীতির বাইরে থেকেই দায়িত্ব পালন করেছেন।
সিএ/এএ


