হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধার করা সম্ভব বলে মনে করেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান। তিনি বলেন, এ লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন ধারাবাহিক প্রচেষ্টা, স্থানীয় উদ্যোগ, নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা।
শনিবার (৬ ডিসেম্বর) বিকেলে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ‘হারিয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনা সভার আয়োজন করে প্রথম আলো। অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, পরিবেশকর্মী, স্থানীয় বাসিন্দা, বন বিভাগ ও প্রশাসনের প্রতিনিধিসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন এবং বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন নিয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন।
চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে স্থানীয় জনগণ, প্রশাসন, পরিবেশবাদী সংগঠন এবং গণমাধ্যমকে একসঙ্গে কাজ করার ওপর জোর দেন মতিউর রহমান। তিনি বলেন, এই ধরনের উদ্যোগ কোনো একক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। সরকার পরিবর্তন, নীতিনির্ধারকদের পরিবর্তন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতার কারণে এটি দীর্ঘ সময়ের একটি প্রক্রিয়া। তাই ধৈর্য ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধারাবাহিকভাবে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
গণমাধ্যমের ভূমিকার বিষয়ে মতিউর রহমান বলেন, প্রথম আলো এই বিষয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করবে। সংবাদ প্রকাশ, বিশেষ আয়োজন, সাক্ষাৎকার এবং রাউন্ড টেবিল আলোচনার মাধ্যমে বিষয়টি সামনে আনা হবে এবং জাতীয় পর্যায়ে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য চেষ্টা করা হবে।
স্থানীয় বিষয়কে জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন তিনি। প্রয়োজনে স্থানীয় প্রতিনিধিদের ঢাকায় এনে মন্ত্রী, সচিব, বন বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের আয়োজন করা যেতে পারে বলেও জানান তিনি। এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিষয়টি গুরুত্ব পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে কীভাবে কাজ এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও মত দেন মতিউর রহমান। তাঁর মতে, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মীদের সমন্বয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলা প্রয়োজন। নিয়মিত আলোচনা, জনসমাবেশ, সচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় রেখে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
এক সময় দেশের অন্যতম প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনের একটি ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। অতীতে চকরিয়া এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে এই বন বিস্তৃত ছিল। পূর্ব দিকে ছিল আরাকান সড়ক, উত্তর–পূর্ব দিকে জনবসতি, কৃষিজমি ও লবণ মাঠ, আর দক্ষিণ দিকে ছিল মহেশখালী চ্যানেল। মাতামুহুরী নদীর পশ্চিম পাশের অংশটি রামপুর এলাকা নামে পরিচিত ছিল এবং পূর্ব পাশের অংশ ছিল চরণদ্বীপ।
চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার শহরে যাওয়ার পথে চকরিয়া উপজেলা শহর অবস্থিত, যেখানে একসময় এই বনটির বিস্তৃতি ছিল। তবে গত কয়েক দশকে নানা কারণে বনটি প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি গাছ টিকে আছে বলে জানা যায়।
চকরিয়া সুন্দরবনের এই পরিস্থিতি নিয়ে গত বছর ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটি মাত্র গাছ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেই প্রেক্ষাপটে আজকের আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
সভায় আরও বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন মোহাম্মদ আল আমীন, প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম, গবেষক সৈয়দ মঈনুল আনোয়ার, চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ণ দেব, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা নাজমুল হুদা এবং কক্সবাজার বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (উত্তর) মো. মারুফ হোসেন।
উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন পেকুয়া উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ইয়াসমিন সুলতানা, বদরখালী সমবায় কৃষি ও উপনিবেশ সমিতির সভাপতি সরওয়ার আলম, চকরিয়া আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. শহীদুল্লাহ্ চৌধুরী, আইনজীবী লুৎফল কবির, চকরিয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি এম জাহেদ চৌধুরী, সাবেক সাধারণ সম্পাদক মিজবাউল হক, উন্নয়ন বিকল্পের নীতিনির্ধারণী গবেষণা (উবিনীগ)–এর আঞ্চলিক ব্যবস্থাপক জয়নাল আবেদীন, চকরিয়া সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল আমিন, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) চকরিয়া উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিন আলো, জীববৈচিত্র্যবিষয়ক গবেষক নাছির উদ্দিন এবং স্থানীয় বাসিন্দা শামসুদ্দিন।
সিএ/এমই


