রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পদ্মা নদীতে বাস দুর্ঘটনায় অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও একমাত্র ছেলেকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন আবদুল আজিজ। বৃহস্পতিবার (২৬ মার্চ) বিকেলে রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামে নিজ বাড়িতে বসে তিনি বলেন, ‘জানেন ভাই, আমার স্ত্রী ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিল। একমাত্র ছেলের বয়স ৬ বছর। স্ত্রী-সন্তান সবাই চলে গেল। আমার কেউ রইল না।’
রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মহেন্দ্রপুর গ্রামে টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটি ঘরে থাকেন আবদুল আজিজ। ঘর থেকে বেরিয়ে আসতেই তাঁর চোখে ক্লান্তি আর শোকে ভেঙে পড়ার দৃশ্য স্পষ্ট। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় নিজের মুঠোফোনে স্ত্রী ও ছেলের ছবি দেখাতে দেখাতে বারবার চোখের পানি মুছছিলেন তিনি।
পদ্মা নদীতে বাস ডুবে তাঁর স্ত্রী নাজমিরা ওরফে জেসমিন (৩০) এবং ছেলে আবদুর রহমান (৬) মারা যান। বুধবার (২৫ মার্চ) বিকেল সোয়া পাঁচটার দিকে গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে ঢাকাগামী সৌহার্দ্য পরিবহনের একটি যাত্রীবাহী বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পন্টুন থেকে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে আসা বাসটিতে প্রায় ৪৫ জন যাত্রী ছিলেন। এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
আবদুল আজিজ জানান, ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বাড়িতে এসেছিলেন তিনি। বুধবার বেলা তিনটার দিকে আবার ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন। সাভারে একটি গার্মেন্টসে চাকরি করেন তিনি। স্ত্রী ও সন্তান ছাড়াও তাঁদের সঙ্গে ছিলেন স্ত্রীর এক স্বজন।
দুর্ঘটনার মুহূর্তের কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ফেরিতে ওঠার জন্য তাঁদের বাসটি সড়ক থেকে ফেরির পন্টুনের ঢালে দাঁড়িয়ে ছিল। বাসের ‘এ’ ও ‘বি’ লাইনে তাঁদের আসন ছিল। দুর্ঘটনার আগে বাসচালক ফোনে কারও সঙ্গে রাগান্বিত কণ্ঠে কথা বলছিলেন। কেন তাঁকে এই ফেরিঘাটে দেওয়া হয়েছে—এ নিয়ে তিনি উচ্চস্বরে কথা বলছিলেন।
এর কিছুক্ষণ পর বাসে হঠাৎ জোরে ঝাঁকুনি লাগে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে বাসটি দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যায় এবং একপর্যায়ে পানিতে পড়ে যায়। তিনি বলেন, ছেলে ছিটকে পড়ে যায়। তখন সামনের সিটে বসা স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরেছিলেন তিনি। কিন্তু দুই সেকেন্ডের বেশি ধরে রাখতে পারেননি। কীভাবে তিনি নিজে পানির ওপর ভেসে উঠেছিলেন, সেটিও মনে করতে পারছেন না।
দুর্ঘটনার পর পুরো রাত দৌলতদিয়ার পদ্মা নদীর তীরে কাটান আবদুল আজিজ। রাত ১২টার দিকে জানতে পারেন তাঁর স্ত্রীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। পরে হাসপাতালে গিয়ে তিনি স্ত্রীর মরদেহ শনাক্ত করেন।
আজ বৃহস্পতিবার ভোরে এক পুলিশ সদস্য তাঁকে জানান, গেঞ্জি পরা ও হাতে ঘড়ি থাকা একটি শিশুর মরদেহ পাওয়া গেছে। সেখানে গিয়ে তিনি নিজের ছেলের মরদেহ শনাক্ত করেন। পরে স্ত্রী ও সন্তানের মরদেহ নিয়ে সকালে নিজ গ্রামে ফিরে যান এবং দুপুরে গ্রামের গোরস্থানে তাঁদের দাফন সম্পন্ন করেন
সিএ/এমই


