চট্টগ্রাম নগরের পূর্ব মাদারবাড়ীর সরু গলিগুলোতে এখনো শোনা যায় সেলাই মেশিনের শব্দ, আঠার গন্ধ আর জুতা তৈরির ব্যস্ততা। তবে এই কর্মচাঞ্চল্য এখন আর সারা বছরের নয়, সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে মূলত ঈদ মৌসুমকে ঘিরে। বছরের বড় সময় অনিশ্চয়তায় কাটালেও ঈদের বাজারকে কেন্দ্র করেই টিকে থাকার চেষ্টা করছেন এখানকার ক্ষুদ্র পাদুকাশিল্পের উদ্যোক্তা ও শ্রমিকেরা।
মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) নগরের পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকার বিভিন্ন কারখানা ঘুরে দেখা যায়, টিনশেড ও ছোট পাকা ঘরের ভেতরে কাঠের পাটাতন তুলে দোতলা কাজের ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিচতলায় জুতার তলা কাটা হচ্ছে, ওপরে চলছে সেলাই ও জোড়া দেওয়ার কাজ। ঈদ সামনে থাকায় কিছুটা ব্যস্ততা থাকলেও মালিকদের ভাষ্য, এই ব্যস্ততা এখন মৌসুমি এবং টিকে থাকার লড়াইয়ের অংশ।
একসময় হাতে তৈরি জুতার জন্য মাদারবাড়ি ছিল সুপরিচিত। এখানকার জুতা সরবরাহ হতো টেরিবাজার, নিউমার্কেট, হকার্স মার্কেটসহ বিভিন্ন এলাকায়, এমনকি দেশের বিভিন্ন জেলাতেও। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কারখানার সংখ্যা, শ্রমিক এবং অর্ডার—সবই কমে গেছে।
পূর্ব মাদারবাড়ীর উদ্যোক্তা তোফাজ্জল হোসেন বলেন, আগে সারা বছরই কাজ থাকত, এখন ঈদ ছাড়া তেমন অর্ডার পাওয়া যায় না। রোজার মাসে কিছু পাইকারি ক্রেতা আসেন এবং তখন কিছুটা কর্মচাঞ্চল্য তৈরি হয়। তবে বছরের বাকি সময়টাতে ব্যবসা চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান ব্যবসায়ী মোহাম্মদ পারভেজ। তাঁর মতে, হাতে তৈরি জুতার ব্যবসা এখন পুরোপুরি মৌসুমি হয়ে গেছে। ঈদের আগে চাহিদা বাড়লেও ঈদের পরপরই অর্ডার কমে যায়। তখন দোকানিরা নতুন করে জুতা তুলতে চান না।
কারখানার মালিক রুবেল হোসেন বলেন, ঈদের সময় কিছু বিক্রি হয় বলেই কারখানা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। অন্য সময়ে বিক্রি এত কম থাকে যে খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হয়। আগে যেখানে একটি কারখানায় ১৫ থেকে ২০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে অনেক কম লোক নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।
১৯৮০ সালের দিকে পূর্ব মাদারবাড়িতে ক্ষুদ্র পাদুকাশিল্পের যাত্রা শুরু হয়। পরে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে এই শিল্প। একসময় এখানে প্রায় এক হাজার কারখানা থাকলেও বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩২০টিতে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, কম দামের বিদেশি জুতার দাপট, দেশের অন্যান্য অঞ্চলে নতুন কারখানা গড়ে ওঠা এবং কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি—এই তিনটি কারণেই সংকটে পড়েছে শিল্পটি। আঠা, রেক্সিন, ফোম, রাবারসহ বিভিন্ন উপকরণের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, কিন্তু জুতার দাম তেমন বাড়ানো যায়নি।
এর প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের জীবনেও। অনেকেই পেশা বদলে অন্য খাতে চলে গেছেন। যারা আছেন, তাঁদের আয় তেমন বাড়েনি, অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে।
তবু পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়নি এই শিল্প। হাতে তৈরি জুতার একটি সীমিত বাজার এখনো রয়েছে। ঈদের সময় সেই বাজার কিছুটা সক্রিয় হয়ে ওঠে। তখন রাত পর্যন্ত চলে কাজ, কারখানাগুলোতে ফিরে আসে কিছুটা প্রাণ।
নুসরাত সুজ প্রতিষ্ঠানের মালিক নুরুল হক বলেন, এখন কম শ্রমিক নিয়ে ছোট পরিসরে কাজ চালাতে হচ্ছে। খরচ কমিয়ে যেভাবে সম্ভব টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।
চট্টগ্রাম ক্ষুদ্র পাদুকা শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি এরশাদ উল্লাহ বলেন, বছরজুড়ে বিক্রি কমে গেছে, কাঁচামালের দাম বেড়েছে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতির কারণে জুতার দাম বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে ব্যবসা দিন দিন সংকুচিত হচ্ছে, শুধু ঈদ মৌসুমেই কিছুটা স্বস্তি মেলে।
সিএ/এমই


