বঙ্গোপসাগরের প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের সৈকতে এ বছর ডিম পাড়তে আসা সামুদ্রিক কাছিমের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। পর্যটক সীমিতকরণ এবং সরকারি নির্দেশনা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের ফলে দ্বীপের নির্জন সৈকতে আবারও ফিরতে শুরু করেছে অলিভ রিডলে প্রজাতির কাছিম। গত ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাসে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে ডিম পাড়তে এসেছে ৬১টি কাছিম, যা গত বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি।
পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ সময় সৈকত থেকে কাছিমের মোট ৫ হাজার ২২টি ডিম সংগ্রহ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে। তবে প্রায় দেড় হাজার ডিম কুকুরের আক্রমণে নষ্ট হয়েছে। গত বছর একই সময়ে সৈকতে ডিম পাড়তে এসেছিল প্রায় ২০টি কাছিম এবং তাদের মধ্যে ১৪টি কাছিমের পাড়া ২ হাজার ৮২৪টি ডিম সংগ্রহ করা হয়েছিল।
কাছিম সংরক্ষণের অংশ হিসেবে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের মধ্যভাগে গলাচিপা এলাকায় মেরিন পার্ক এবং কোনারপাড়ায় দুটি হ্যাচারি স্থাপন করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর। সেখানে সংগ্রহ করা ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর কার্যক্রম চলছে। স্থানীয় পরিবেশকর্মী আবদুল আজিজের নেতৃত্বে ১১ জন স্বেচ্ছাসেবী এই হ্যাচারি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পালন করছেন।
আবদুল আজিজ বলেন, ‘হ্যাচারি দুটিতে বর্তমানে ৪৫টি কাছিমের পাড়া ৫ হাজার ২২টি ডিম সংরক্ষণ করা আছে। অলিভ রিডলে প্রজাতির কাছিমগুলো ডিম পেড়েছে ৬ ডিসেম্বর থেকে ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিন মাস সময়ে। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি একটি হ্যাচারিতে ডিম থেকে ১২২টি কাছিম ছানার জন্ম হয়েছে। পরে ছানাগুলো সাগরে অবমুক্ত করা হয়।’
তবে সুখবরের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে। একই সময়ে দ্বীপের সৈকত থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ২১টি মৃত কাছিম। এসব কাছিমের শরীরে আঘাতের চিহ্ন ছিল এবং পেটেও ডিম পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, গভীর সমুদ্র থেকে সৈকতে ডিম পাড়তে আসার পথে মাছ ধরার নিষিদ্ধ জাল বা ট্রলিং জাহাজের জালে আটকা পড়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীদের দাবি, পর্যটক নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশ রক্ষায় সরকারি পদক্ষেপের কারণে দ্বীপের পরিবেশ ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে। এর ফলে কাছিমের ডিম পাড়ার উপযোগী পরিবেশও ফিরতে শুরু করেছে।
সেন্ট মার্টিনের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমদ খান ও নুর আহমদ বলেন, ১০ থেকে ১৫ বছর আগেও এই দ্বীপের সৈকতে তিন প্রজাতির কাছিম ডিম পাড়তে আসত। বিভিন্ন কারণে গত কয়েক বছরে তাদের উপস্থিতি কমে যায়। বর্তমানে অলিভ রিডলে প্রজাতির কাছিম আবার ডিম পাড়তে আসছে। গত বছর কাছিমের ডিম থেকে ২ হাজার ১৬৫টি ছানা সাগরে অবমুক্ত করা হয়েছিল, এবার সেই সংখ্যা ছয় হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কক্সবাজার বন ও পরিবেশ সংরক্ষণ পরিষদের সভাপতি দীপক শর্মা বলেন, সেন্ট মার্টিনের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় গত দুই বছরে সরকার পর্যটক সীমিতকরণসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। এর ফলে দ্বীপের সৈকতে শামুক, ঝিনুক ও কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর বিস্তার ঘটছে এবং সামুদ্রিক কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশও ফিরছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিচালক মো. জমির উদ্দিন বলেন, সেন্ট মার্টিনের পাশাপাশি কক্সবাজার ও মহেশখালীর সোনাদিয়া সৈকতেও কাছিমের ডিম পাড়ার পরিবেশ নিশ্চিত করতে কাজ করছে সরকার। কাছিমের ডিম যেন শিয়াল, কুকুর, গুইসাপ বা বেজি খেয়ে ফেলতে না পারে, সে জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, সামুদ্রিক কাছিম সমুদ্রের পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তারা আগাছা, ক্ষতিকর জেলিফিশ ও বিভিন্ন আবর্জনা খেয়ে সমুদ্রকে দূষণমুক্ত রাখতে সহায়তা করে এবং পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
দ্বীপটির জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় গত বছরের ২২ অক্টোবর ১২ দফা নির্দেশনা জারি করে। সেখানে বলা হয়, প্রতি বছর ১ নভেম্বর থেকে তিন মাসের জন্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত থাকবে। এ সময় দৈনিক সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে রাতযাপনের সুযোগ থাকলেও নভেম্বর মাসে তা নিষিদ্ধ রাখা হয়েছে।
সিএ/এমই


