ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী কিশোরী সাবা ইসলাম রংতুলি আর ক্যানভাসে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে চলেছে। কথা বলতে পারে না, কানে শুনতেও পায় না—তবু তার আঁকা ছবিতে ফুটে ওঠে জীবনের নানা গল্প। সপ্তম শ্রেণিতে পড়া এই কিশোরী ছবি আঁকার মধ্যেই খুঁজে পেয়েছে নিজের নতুন এক দিগন্ত।
মুক্তাগাছা পৌরসভা থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের কাঠগড়া গ্রামে সাবার বাড়ি। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের বড় সন্তান সে। বাবা শফিউল আলম একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন এবং মা মুসলিমা খাতুন গৃহিণী। পরিবারের ছোট ছেলে আহনাফ ইসলাম। সাবা স্থানীয় আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী।
সম্প্রতি সাবাদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের দুই কক্ষের ঘরের দেয়ালজুড়ে ঝুলছে নানা ধরনের চিত্রকর্ম। ঘরের এক পাশে শোকেসে সাজানো রয়েছে অসংখ্য পুরস্কার। সেখানে রয়েছে ছবি এঁকে পাওয়া ক্রেস্ট, মেডেল, বই ও সনদপত্র। সাবার আঁকা ছবির মধ্যে রয়েছে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের পোর্ট্রেট, আর্জেন্টাইন ফুটবল তারকা মেসি, বই হাতে শিশু, গ্রামীণ দৃশ্য এবং ষাঁড়ের লড়াইসহ নানা বিষয়।
এক দুপুরে দেখা যায়, সাবা টেবিলে বসে জলরঙে অমর একুশের একটি ছবি আঁকছে। পাশে দাঁড়িয়ে মেয়ের কাজ দেখছিলেন মা। সাবা জলরং, তেলরং কিংবা পেন্সিল স্কেচ—সব মাধ্যমেই সমান স্বচ্ছন্দ। এই বয়সেই সে এঁকেছে কয়েক শ ছবি এবং বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে অর্জন করেছে অসংখ্য পুরস্কার।
সাবার মা মুসলিমা খাতুন জানান, মেয়ের বয়স যখন মাত্র নয় মাস, তখনই তারা বুঝতে পারেন সে কানে শুনতে পায় না এবং কথা বলতে পারে না। বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর পরিবারটি খুব কষ্ট পেলেও ধীরে ধীরে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়। ছোটবেলা থেকেই সাবাকে মাটিতে নানা কিছু আঁকতে দেখা যেত। পরে তাকে আঁকা শেখানোর জন্য প্লে ক্লাসে ভর্তি করানো হয় এবং পরবর্তী সময়ে টাঙ্গাইলের শিশু একাডেমি ও শিল্পকলা একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নিয়ে সে আরও দক্ষ হয়ে ওঠে।
মুসলিমা খাতুন বলেন, ‘সে জলরং, তেলরং, পেস্টিং, মোমরংসহ সব ধরনের রং দিয়ে ছবি আঁকতে পারে। যেকোনো প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে সে কোনো না কোনো পর্যায়ে পুরস্কৃত হয়। তার ক্রেস্ট আছে অন্তত ৬০টি, বই আছে চার-পাঁচ শ, সনদ আছে দুই থেকে আড়াই শ। সে মানুষের পোর্ট্রেট ও গ্রামীণ দৃশ্য বেশি আঁকে। সে যা দেখে, তা–ই আঁকতে পারে। মা হিসেবে আমার গর্ব হয় যে আমার প্রতিবন্ধী মেয়েকে নিয়ে এতদূর আগাতে পারছি।’
সাবার বাবা শফিউল আলম বলেন, ‘যখন বুঝতে পারি মেয়ে বাক্ ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী, তখন আমরা চিকিৎসকের কাছে যাই। চিকিৎসক পরামর্শ দিয়েছিলেন উন্নত চিকিৎসার জন্য। চিকিৎসায় ১২ থেকে ১৫ লাখ টাকা দরকার। তিন-চার বছর পরপর আবার তিন-চার লাখ করে টাকা লাগবে। আমাদের মতো নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে এটি করা সম্ভব হয়নি।’ তিনি আরও বলেন, ‘মেয়ের চার-পাঁচ বছর বয়সে আমরা যখন দেখি, সে কোনো কিছু দেখেই লিখতে পারে, ছবি আঁকতে পারে; তখন বুঝতে পারি, তার ছবি আঁকার প্রতি আলাদা আকর্ষণ রয়েছে।’
নাতনির সাফল্যে আনন্দিত সাবার দাদি আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, ‘জন্মের পর যখন দেখেছি মেয়েটা কথা বলতে পারে না, কানে শোনে না তখন অনেক দুঃখ হয়েছে; কিন্তু আমাদের তো করার কিছুই নেই। এখন আমার নাতনি যে পর্যায়ে গেছে, সে যেন আরও ভালো করে, তার নাম যেন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে, সেই দোয়া করি। সে যা দেখে, তা–ই আঁকতে পারে। এখন আর দুঃখ করি না, নাতনিকে নিয়ে গর্ব হয়।’
সাবার বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বছির উদ্দিন বলেন, ‘সাবা আমাদের বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী। সে অনেক ভালো ছবি আঁকে। সে একদিন আমার ছবি এঁকে নিয়ে আসে, যা দেখে অভিভূত হই। সে কিছু দেখলেই হুবহু আঁকতে পারে। তার অদম্য মেধা সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়ুক।’
সিএ/এমই


