চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার পাহাড়ঘেরা জঙ্গল সলিমপুর এলাকা এক সময় ছিল আতঙ্কের জনপদ। প্রবেশপথে থাকত সশস্ত্র পাহারা, ভেতরে ঢুকতে হলে দেখাতে হতো বিশেষ পরিচয়পত্র। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও অনেক সময় সেখানে ঢুকতে পারেননি। অভিযানে গিয়ে হামলার মুখে ফিরে আসার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। তবে সাম্প্রতিক একটি বড় অভিযানের পর সেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। এখন পুরো এলাকা প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সেখানে নিয়মিত টহল দিচ্ছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত ২ মার্চ সেনাবাহিনী, র্যাব, পুলিশ ও বিজিবির সমন্বয়ে পরিচালিত যৌথ অভিযানের পর জঙ্গল সলিমপুরের পরিস্থিতি বদলে যায়। দীর্ঘদিন পর বড় পরিসরের এই অভিযান কোনো রক্তপাত ছাড়াই শেষ হয়। অভিযানের আগেই চিহ্নিত অনেক সন্ত্রাসী এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যায়। অভিযানের পরপরই যৌথ বাহিনী পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং নিরাপত্তা জোরদার করতে সেখানে পুলিশের দুটি অস্থায়ী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। এখন নিয়মিত টহল চলছে এবং সাধারণ মানুষও স্বাভাবিকভাবে চলাচল করছেন। শুক্রবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে এলাকা ঘুরে এই পরিবর্তনের চিত্র দেখা গেছে।
তবে শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতির পরিবর্তন নয়, জঙ্গল সলিমপুরের পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের জমি দখল, পাহাড় কেটে বসতি গড়া এবং কোটি টাকার প্লট–বাণিজ্যের ইতিহাস। প্রায় ৩ হাজার ১০০ একর আয়তনের এই এলাকায় কয়েক দশক ধরে বিভিন্ন দখলদার গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ছিল। সাম্প্রতিক অভিযানের পর প্রথমবারের মতো সেখানে দৃশ্যমানভাবে প্রশাসনের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়েছে।
পাহাড়বেষ্টিত এই এলাকাটি ২০০০ সালের পর থেকেই সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর দখলে চলে যায়। একাধিকবার প্রশাসন অভিযান চালালেও প্রতিরোধের মুখে তা সফল হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপর হামলার ঘটনাও ঘটেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় র্যাবের একটি অভিযানে সন্ত্রাসীদের হামলায় একজন সদস্য নিহত হওয়ার ঘটনাও ঘটেছিল।
জঙ্গল সলিমপুরে ঢোকার প্রধান পথটি চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ-ফৌজদারহাট সংযোগ সড়ক থেকে পাহাড়ের ভেতরে ঢুকে গেছে। সেই পথ ধরে এখন দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন দৃশ্য। পাহাড় কেটে তৈরি সরু ও প্রশস্ত পথে মানুষ অবাধে চলাফেরা করছে। বাজারে দোকানপাট খোলা, রাস্তার ধারে শিশুরা খেলছে। কোথাও কোথাও পুলিশের টহল দল অবস্থান করছে।
এস এম পাইলট উচ্চবিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় এখন একটি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প বসানো হয়েছে। সেখানে প্রায় ১৩০ জন পুলিশ সদস্য অবস্থান করছেন। এছাড়া আলীনগর উচ্চবিদ্যালয়ে আরও একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রায় ২৩০ জন র্যাব, পুলিশ ও এপিবিএন সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। টহলরত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরিফুল ইসলাম সিদ্দিকী জানান, বর্তমানে এলাকায় দৃশ্যমান কোনো সন্ত্রাসী নেই এবং স্থানীয় মানুষও পুলিশের সঙ্গে সহযোগিতা করছেন। স্বাভাবিক অবস্থা বজায় রাখতে নিয়মিত টহল অব্যাহত থাকবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, আগের তুলনায় এখন পরিস্থিতি অনেক শান্ত। বাজারে দেখা হওয়া আবদুল মান্নান জানান, তিনি প্রায় ১০ বছর ধরে এলাকায় বসবাস করছেন। তাঁর ভাষায়, ‘আগের চেয়ে ভালো আছি। এভাবে থাকতে পারলেই হয়।’ তিনি বলেন, আগে বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ হতো এবং বাইরে থেকে অস্ত্রধারীরা আসত। রাতের পর রাত অনিশ্চয়তার মধ্যে কাটাতে হতো। এখন অন্তত সেই ভয় অনেকটাই কমেছে।
জঙ্গল সলিমপুরের সংকটের অন্যতম কারণ ছিল পাহাড় কেটে গড়ে ওঠা প্লট–বাণিজ্য। প্রায় ৩০টি পাহাড় ধাপে ধাপে কেটে সমতল করা হয়েছে এবং ছোট ছোট প্লটে ভাগ করে বসতি গড়ার জন্য বিক্রি করা হয়েছে। শহরের কাছাকাছি তুলনামূলক কম দামে জমি দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে এতে যুক্ত করা হয়।
পুলিশ ও জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, আলীনগর এলাকায় আড়াই কাঠা আকারের একটি প্লট প্রায় ৩০ লাখ টাকায় বিক্রি হতো। আরও ছোট আকারের কিছু প্লট প্রায় পাঁচ লাখ টাকায় বিক্রি করা হয়েছে। ছোট প্লটের সংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার, যার মধ্যে অন্তত ২৩ হাজার ইতিমধ্যে বিক্রি হয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। গত কয়েক দশকে এই এলাকায় হাজার কোটি টাকার প্লট–বাণিজ্য হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
যৌথ অভিযানের পর নতুন করে প্লট কেনাবেচা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। জমি কেনাবেচার মধ্যস্থতাকারীরা বলছেন, নতুন কোনো ক্রেতা এখন আসছেন না এবং আগে যারা জমি কিনেছেন তারাও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন।
অতীতে জঙ্গল সলিমপুরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান প্রায়ই হামলার মুখে পড়ত। পাহাড়ের ওপর থেকে ইটপাটকেল, ককটেল বা গুলিও ছোড়া হতো। সর্বশেষ গত ১৯ জানুয়ারি অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে সন্ত্রাসীদের হামলায় র্যাব কর্মকর্তা মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। তিনি র্যাব-৭–এর উপসহকারী পরিচালক ছিলেন। এর আগেও বিভিন্ন অভিযানে প্রশাসনের সদস্যরা আহত হয়েছেন।
তবে ২ মার্চের অভিযানটি ছিল ব্যতিক্রম। প্রায় ৩ হাজার ২০০ সদস্যের যৌথ বাহিনী পরিকল্পিতভাবে অভিযানে অংশ নেয়। আগের রাতে আলীনগরে ঢোকার পথে ব্যারিকেড ও একটি কালভার্ট ভেঙে দেওয়া হলেও বাহিনীর সদস্যরা তা মেরামত করে অভিযান শুরু করেন। ভোর পাঁচটা থেকে দুপুর দুইটা পর্যন্ত প্রায় নয় ঘণ্টা অভিযান চালিয়ে পুরো এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেওয়া হয়।
এই অভিযানে বিভিন্ন স্থান থেকে ৩০টি আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় সীতাকুণ্ড থানায় তিনটি মামলা হয়েছে এবং ২২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এখনো পলাতক রয়েছেন।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের উপমহাপুলিশ পরিদর্শক আহসান হাবীব পলাশ বলেন, ‘আমাদের মূল ফোকাস ছিল এই বিশাল অংশে আমাদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং আমরা সেটি করতে পেরেছি। পুলিশ ও র্যাবের দুটি ক্যাম্প এখানে কাজ করছে। ক্যাম্পের নিরাপত্তা বিধানে যদি এখানে কামান দেওয়া লাগে, আমরা কামান দেব।’
এদিকে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর আবার আলোচনায় এসেছে জঙ্গল সলিমপুরে পরিকল্পিত সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের বিষয়টি। এর আগে ২০২২ সালে এলাকাটিকে কয়েকটি ভাগে ভাগ করে কেন্দ্রীয় কারাগার-২, মডেল মসজিদ, নভোথিয়েটার, আইটি পার্কসহ বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। কিন্তু দখলমুক্ত করা সম্ভব না হওয়ায় সেগুলো বাস্তবায়ন এগোয়নি।
প্রশাসন সূত্র বলছে, বর্তমানে সামরিক-বেসামরিক, সরকারি-বেসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত অন্তত ৪৮টি প্রতিষ্ঠান সেখানে জমি চেয়ে আবেদন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম সেনানিবাস, বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ বেতার, র্যাব-৭, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ, চট্টগ্রাম ওয়াসা, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সংস্থা।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, একটি মহাপরিকল্পনার মাধ্যমে ধাপে ধাপে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হবে। জঙ্গল সলিমপুরের পরিবেশ ও প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যায়, সে বিষয়টি যাচাই করতে একটি কমিটি কাজ করবে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম বলেন, জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি জমি যাতে আর কোনোভাবে দখলে না যায়, সে জন্য দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে পরিকল্পিত উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে এলাকাটি সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রাখার বিষয়টিও বিবেচনা করা যেতে পারে।
সিএ/এমই


