রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গগামী মানুষের ঈদযাত্রা সামনে রেখে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কে আবারও বড় ধরনের যানজটের শঙ্কা দেখা দিয়েছে। আশুলিয়ায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ, গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড়ে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ এবং চার লেন মহাসড়কের সঙ্গে দুই লেনের যমুনা সেতুর সংযোগ—এসব কারণে ঈদের সময় ভোগান্তি বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রতিবছরের মতো এবারও ঈদের আগে দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে বিপুল সংখ্যক মানুষ রাজধানী ছেড়ে গ্রামের পথে রওনা হবেন। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের ধারণা, এ সময় প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ত্যাগ করবেন। হাইওয়ে পুলিশ সারা দেশে যানজটের সম্ভাব্য ২০৭টি স্থান চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে ঢাকা-টাঙ্গাইল-রংপুর মহাসড়কেই রয়েছে ৫৫টি ঝুঁকিপূর্ণ স্থান।
তবে সম্ভাব্য ভোগান্তি কমাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু প্রস্তুতির কথাও বলা হচ্ছে। আশুলিয়া-বাইপাইল সড়কের কিছু নতুন লেন যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া, চন্দ্রা এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং যমুনা সেতুর টোল প্লাজায় বুথ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবুও সড়কের সংকুচিত অংশ, অবৈধ পার্কিং এবং ফিটনেসবিহীন যানবাহনের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে না এলে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
আশুলিয়া এলাকায় ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় সড়কের বেশ কিছু অংশ সংকুচিত হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও পিলার নির্মাণের কাজ চলছে, আবার কোথাও কার্পেটিং উঠে গিয়ে সড়ক উঁচু–নিচু হয়ে আছে। আট কিলোমিটার অংশের অনেক জায়গায় ইটের সুরকি বের হয়ে গেছে এবং ধুলা কমাতে পানি ছিটানোয় কাদার সৃষ্টি হয়েছে।
এ সড়কে নিয়মিত চলাচল করেন আশুলিয়া ক্লাসিক পরিবহনের চালক লুৎফুর রহমান। তিনি বলেন, ‘এই রোডে অটোর (ব্যাটারিচালিত রিকশা) জ্বালায় ছয় চাক্কা (বাস-ট্রাক) তো চলেই না, দেহা গেছে তিনডা গাড়ি থাকলে হাজারটা অটো থাকে জামগড়া এলাকায়। ঈদের সময় তো পুরাপুরি লক থাকে। এবার তো কাজকাম চলতাছে। এহনও তো ৩০ মিনিটের রাস্তা প্রায় দেড় ঘণ্টা লাগছে।’
আরেক বাসচালক সামিদুল ইসলাম জানান, রোববার দুপুর ১২টায় আবদুল্লাহপুর থেকে যাত্রা শুরু করে তিনি বাইপাইল পৌঁছাতে বিকেল তিনটা বেজে যায়। তিনি বলেন, ‘এক ঘণ্টার রাস্তা না, কিন্তু হপায় (কেবল) আইছি আমি। এক জাগায় আমি দুই ঘণ্টা বহা। ঈদের সময় যানজট আরও বেশি বাঁধব। আরও অনেকটা কষ্ট বেশি হইব।’
ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, গত ঈদের তুলনায় এবার প্রকল্পের অগ্রগতি বেশি হয়েছে। আট কিলোমিটারের মধ্যে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার সাববেস পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে এবং তিন কিলোমিটারের বেশি অংশে কার্পেটিং হয়েছে। ঈদযাত্রা শুরু হওয়ার আগেই কিছু অংশ যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ঢাকা জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম, অপস্ ও ট্রাফিক উত্তর) আরাফাতুল ইসলাম বলেন, সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় এবং ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। সড়কের ভাঙাচোরা অংশ মেরামতের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগের সঙ্গেও আলোচনা হয়েছে।
গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড়কে দীর্ঘদিন ধরেই যানজটের অন্যতম বড় কেন্দ্র হিসেবে দেখা হয়। ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক, চন্দ্রা-নবীনগর সড়ক এবং আশপাশের স্থানীয় সড়ক মিলিত হওয়ায় তিন দিক থেকে বিপুল যানবাহন এখানে এসে জমা হয়। শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলোর যানবাহন ও শ্রমিক পরিবহনের চাপও এতে যুক্ত হয়।
বগুড়াগামী যাত্রী হালিম মোল্লা বলেন, ঈদের সময় ঢাকা থেকে বের হতে পারলেও চন্দ্রা এলাকায় এসে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকা থাকতে হয়। কিন্তু চন্দ্রা পার হওয়ার পর আবার সড়ক স্বাভাবিক হয়ে যায়।
শ্যামলী পরিবহনের চালক কবির হোসেন বলেন, সাধারণ সময়ে ঢাকা থেকে চন্দ্রা পর্যন্ত যেতে দুই ঘণ্টা সময় লাগে। কিন্তু ঈদের সময় তা পাঁচ ঘণ্টা পর্যন্ত লেগে যায়।
কোনাবাড়ী হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সওগাতুল আলম বলেন, ঈদের সময় যানবাহনের চাপ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। যান চলাচল স্বাভাবিক রাখতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হবে।
চন্দ্রা থেকে যমুনা সেতু পর্যন্ত মহাসড়কের বেশির ভাগ অংশ চার লেন হলেও যমুনা সেতু দুই লেন হওয়ায় সেখানে যানজটের আশঙ্কা থাকে। এছাড়া ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকল হয়ে গেলে বা টোল আদায়ে ধীরগতি দেখা দিলে যানজট দ্রুত বাড়তে পারে।
টাঙ্গাইলের পুলিশ সুপার মুহম্মদ শামসুল আলম সরকার বলেন, সম্ভাব্য সমস্যার স্থানগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। ঈদের পাঁচ দিন আগে থেকে মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণে প্রায় এক হাজার পুলিশ সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
যমুনা সেতু টোলপ্লাজা সূত্র জানায়, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২০ থেকে ২১ হাজার যানবাহন সেতু পার হয়। ঈদের সময় এই সংখ্যা কয়েক গুণ বেড়ে যায়। গত বছর ঈদুল ফিতরের ছুটিতে এক দিনে ৪৮ হাজার ৩৬৮টি যানবাহন সেতু পার হয়েছিল।
এদিকে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ চৌরাস্তা মোড়েও যানজটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সেখানে ছয় লেন মহাসড়ক উন্নয়ন এবং উড়ালসড়কের নির্মাণকাজ চলমান থাকায় চারদিক থেকে আসা যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে।
গোবিন্দগঞ্জ ট্রাফিক পুলিশের পরিদর্শক মোস্তফা আল মামুন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে ট্রাফিক পুলিশ ছাড়াও থানা-পুলিশ, হাইওয়ে পুলিশ ও স্বেচ্ছাসেবকেরা যান চলাচল নিয়ন্ত্রণে কাজ করবেন।
গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান মোল্লা বলেন, ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন রাখতে ১৫ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত গোবিন্দগঞ্জের ছয় লেন মহাসড়কের নির্মাণকাজ বন্ধ রাখা হবে। পাশাপাশি সেখানে পুলিশ বক্স স্থাপন, স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ এবং মাইকিং ব্যবস্থাও চালু রাখা হবে।
সিএ/এমই


