বগুড়াকে ঘিরে গড়ে ওঠা দেশের অন্যতম বড় মসলার বাজারে দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল মসলার কারবার চলছেই। বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা মসলা স্থানীয় গুদাম বা কারখানায় এনে তাতে ভেজাল মিশিয়ে নামী প্রতিষ্ঠানের মোড়কে বাজারজাত করার অভিযোগ উঠেছে। এসব ভেজাল মসলা রাজাবাজারসহ বিভিন্ন পাইকারি আড়ত থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে।
জেলা প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে অভিযান চালিয়ে জেল-জরিমানা করলেও ভেজাল মসলার এই কারবার থামছে না। এতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, ভেজাল মসলার কারণে বগুড়ার বাজারের প্রতি দেশের ব্যবসায়ীদের আস্থা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মঙ্গলবার দুপুরে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং র্যাব-১২ এর ক্রাইম প্রিভেনশন স্পেশালাইজড কোম্পানি বগুড়া ক্যাম্প যৌথভাবে শহরের ফতেহ আলী বাজারে অভিযান চালায়। অভিযানে অনুমোদনহীন দুটি মসলা কারখানায় মোট ৭০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে পচা ও নিম্নমানের মরিচের সঙ্গে ধানের তুষ মিশিয়ে মরিচের গুঁড়া তৈরির অভিযোগে দোলন মসলা মিলের মালিক মো. দোলনকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই অভিযানে নষ্ট ও নিম্নমানের হলুদ ভেজাল মিশিয়ে সংরক্ষণ করায় বগুড়া হলুদ মিলের মালিক রোকনুজ্জামানকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
অভিযানে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মেহেদী হাসান এবং কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক ফজিলাতুন্নেসা ফৌজিয়াসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে সোমবার সদর উপজেলার এরুলিয়া এলাকায় জেলা প্রশাসন, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং র্যাবের যৌথ অভিযানে আরেকটি গুদামে জিরার সঙ্গে ক্যারাওয়ে সিড মিশিয়ে বিদেশি ব্র্যান্ডের মোড়কে বাজারজাত করার প্রমাণ পাওয়া যায়। ওই ঘটনায় ব্যবসায়ী শাহিদ আলমকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। এ সময় গুদাম থেকে ৪২ বস্তা জিরা এবং ১৯২ বস্তা ক্যারাওয়ে সিড জব্দ করা হয়। জব্দ করা মসলাগুলো যথাযথভাবে বিক্রির জন্য বগুড়া আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযানে নেতৃত্ব দেন জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফয়সাল আহমাদ।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বগুড়া কার্যালয়ের কর্মকর্তা মো. রাসেল বলেন, আমদানি করা জিরার পাইকারি বাজারমূল্য প্রতি কেজি ৫৬০ থেকে ৫৮০ টাকা, অন্যদিকে সুগন্ধযুক্ত পার্সিয়ান জিরা নামে পরিচিত ক্যারাওয়ে সিডের পাইকারি মূল্য প্রতি কেজি প্রায় ২৪০ টাকা। তিনি জানান, এরুলিয়ার একটি গুদামে দীর্ঘদিন ধরে জিরার সঙ্গে কম দামের ক্যারাওয়ে সিড পলিশ করে প্যাকেটে ভরে ভারতীয় ব্র্যান্ড বিটি ডায়মন্ড জিরা নামে বাজারজাত করা হচ্ছিল, যা ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল।
বগুড়া জেলা মসলা আমদানিকারক ও মসলা ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি এবং ওম এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পরিমল প্রসাদ (রাজ) বলেন, বগুড়ায় বছরে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার বেশি মসলা আমদানি হয়। বিশাল এই বাজারকে কেন্দ্র করে এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে ভেজাল মসলার কারবার চালিয়ে যাচ্ছে। এসব ভেজাল পণ্য দেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে পড়ায় মসলার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং বগুড়ার ব্যবসায়ীদের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
গত দেড় বছরে বগুড়ায় ভেজাল মসলা ঠেকাতে অন্তত ১০টি বড় অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। রাজাবাজারের একটি কারখানায় কাপড়ের রং, গোখাদ্য ও ধানের তুষ মিশিয়ে হলুদ ও মরিচের গুঁড়া তৈরির দায়ে আল-আমিন মসলা মিলকে ৩ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। শাজাহানপুর উপজেলার মাদলা কাজিপাড়া এলাকায় কাপড়ের রং ও পচা উপাদান মিশিয়ে ভেজাল মসলা তৈরির দায়ে আরএসি ইন্ডাস্ট্রি নামে একটি অনুমোদনহীন কারখানায় অভিযান চালিয়ে ৩ লাখ টাকা জরিমানা এবং একজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া শহরের মগলিশপুর এলাকায় জংলি ফল তারাগোটায় রাসায়নিক ও রং মিশিয়ে কালো এলাচি তৈরি করে বিক্রির দায়ে একজন ব্যবসায়ীকে অর্থদণ্ড দেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। বাদুড়তলা এলাকার একটি গুদামে জিরার সঙ্গে অন্য মসলা ও বালু মিশিয়ে এবং পানি দিয়ে ওজন বাড়িয়ে বাজারজাত করার অভিযোগে মেসার্স আলী এন্টারপ্রাইজের মালিক আলী আহম্মেদকে ২ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। রাজাবাজারে গোখাদ্যে রং মিশিয়ে হলুদ ও মরিচের গুঁড়া তৈরির অভিযোগে একটি কারখানা সিলগালা করা হয়।
এক অভিযানে মেয়াদোত্তীর্ণ ও খাওয়ার অনুপযোগী মসলা মজুত করার দায়ে জাহাঙ্গীর স্টোরকে ৫ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অন্যদিকে ইটের গুঁড়া, তুষ ও কাঠের রং মিশিয়ে মসলা তৈরির অপরাধে সুলতান বাদশাহ নামে এক ব্যবসায়ীকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। একইভাবে চেলোপাড়ার একটি গুদামে কালো এলাচি পানিতে ভিজিয়ে ওজন বাড়ানো এবং মেয়াদোত্তীর্ণ মসলা মজুত রাখার দায়ে ব্যবসায়ী জগদীশ প্রসাদকে এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়।
বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের নেফ্রোলজি বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক এহসানুল করিম বলেন, যেকোনো ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক মানুষের শরীরের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হতে পারে। মসলায় ক্ষতিকর রাসায়নিক বা রং ব্যবহার করা হলে তা হৃদ্যন্ত্র, লিভারসহ শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ বিকল করে দিতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
সিএ/এমই


