ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী নগরের বিভিন্ন কেন্দ্রে সাধারণ ভোটারদের ভিড়ের পাশাপাশি চোখে পড়েছে হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যদের উপস্থিতিও। বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকালে শিরোইল কলোনি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও উচ্চবিদ্যালয় কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, শাড়ি কিংবা সালোয়ার-কামিজ পরিহিত কয়েকজন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ভোট দিতে এসেছেন। কারও ভোট দেওয়া সহজ হয়েছে, আবার কেউ পড়েছেন ভোগান্তিতে। তবে ভোটাধিকার প্রয়োগের পর তাঁদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তি ও আনন্দের ছাপ।
রাজশাহীর ‘দিনের আলো হিজড়া সংঘের’ কোষাধ্যক্ষ মিস জুলি সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ভোট দেন। কেন্দ্রের বাইরে দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা হিজড়া জনগোষ্ঠীর মানুষ। আজকে ভোট দিতে এসে ভালো লাগছে। জয়-পরাজয় থাকবেই। কিন্তু যেই জিতুক, সে যেন মানুষের জন্য কাজ করে—এটাই চাই।’
কথা বলতে গিয়ে তিনি জানান দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিজ্ঞতা। জুলি বলেন, ‘আমাদের পিছিয়ে পড়া বলা হয়। কিন্তু আমরা পিছিয়ে পড়া নই, আমাদের পিছিয়ে রাখা হয়েছে। সমাজের উচ্চবিত্তরা আমাদের সুযোগ দেয়নি। আমরা দেশ ও জাতির সম্পদ হিসেবে কাজ করতে চাই। আমাদেরও কাজে লাগাতে হবে। কাউকে পিছিয়ে রেখে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়া সম্ভব নয়।’
তবে ভোট দিতে গিয়ে তাঁকে দাঁড়াতে হয়েছে পুরুষদের লাইনে। কারণ জাতীয় পরিচয়পত্রে তিনি ‘পুরুষ’ হিসেবে নিবন্ধিত। তিনি বলেন, ‘আমি নারীসুলভ পোশাকে ও আচরণে। এখন ছেলেদের লাইনে দাঁড়ানো আমার জন্য খুবই অস্বস্তিকর। তাই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করি—কখন লাইন ফাঁকা হবে, তখন গিয়ে ভোট দিই।’ তাঁর দাবি, হিজড়া হিসেবে স্বীকৃত ভোটারের পরিচয় নিশ্চিত করতে হবে।
একই অভিজ্ঞতার কথা জানান হিজড়া জনগোষ্ঠীর আরেক সদস্য মিঠু। তিনিও পুরুষদের কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন। মিঠু বলেন, ‘আমাদের কোনো আলাদা সিরিয়াল নেই। দুই ঘণ্টা ঘুরে শেষে ভোট দিতে পেরেছি। ভোট না দিতে পারলে খুবই খারাপ লাগত। দেশের নাগরিক হিসেবে ভোট দিতে পেরে ভালো লাগছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যেহেতু আমি হিজড়া, আমি হিজড়া হিসেবেই ভোট দিতে চাই। আগে ছেলে হিসেবে ভোটার করা হয়েছিল। এখন সরকারিভাবে হিজড়াদের স্বীকৃতি আছে। তাই ভোটার তালিকায়ও সেই পরিচয় চাই।’
ভোট দিতে এসে ভোগান্তির শিকার হয়েছেন মিস রীতাও। তিনি বলেন, ‘একবার বলছে চারতলায় যান, আবার বলছে তিনতলায়। এক বিল্ডিং থেকে আরেক বিল্ডিংয়ে পাঠানো হয়েছে। লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও ঠিকমতো তথ্য না পাওয়ায় বারবার ঘুরতে হয়েছে।’ তাঁর আক্ষেপ, ‘আমরা অস্বাভাবিক মানুষ নই। স্বাভাবিক মানুষের মতোই ভোট দিতে চাই। এই বৈষম্য আর চাই না।’
হিজড়া জনগোষ্ঠীর সদস্যরা জানান, নির্বাচনের সময় প্রার্থীরা এলাকায় ভোট চাইতে এলেও তাঁদের বাসায় খুব কমই যান। জুলি বলেন, ‘পাশের বাড়িতে গিয়ে ভোট চায়। কিন্তু আমাদের দরজায় কড়া নাড়ে না। অনেকে এখনো জিজ্ঞেস করে, আপনাদের কী ভোট আছে? আমরা বলি, হ্যাঁ, আমাদেরও ভোট আছে।’
‘দিনের আলো হিজড়া সংঘ’ সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৯টি উপজেলায় প্রায় ১ হাজার ২০০ জন তৃতীয় লিঙ্গের সদস্য রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত এক হাজার ভোটার হিসেবে তালিকাভুক্ত। তবে নানা সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিবন্ধকতার কারণে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতির হার তুলনামূলক কম বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
সিএ/জেএইচ


