‘নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন: সংসদে কার্যকর প্রতিনিধিত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্রথম আলো কার্যালয়ে। বৈঠকে বক্তারা বলেন, জাতীয় সংসদের সরাসরি ৩০০ আসনের মধ্যে মাত্র ৭টিতে নারী রয়েছেন, যা মাত্র ২ শতাংশের সামান্য বেশি। রাজনীতিতে নারীর অংশগ্রহণ বাড়াতে এবং নেতৃত্ব বিকাশে বাধাগুলো দূর করা প্রয়োজন। শিগগিরই সংসদের ৫০টি সংরক্ষিত আসনের মনোনয়ন শুরু হবে, যেখানে নারীরা যেন শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারেন, সেই সুযোগ তৈরি করা জরুরি।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) ও প্রথম আলো আয়োজিত বৈঠকে অংশগ্রহণকারীরা বলেন, নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বাড়াতে রাজনৈতিক দলগুলোকে অনলাইনে ছড়ানো ভ্রান্ত ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে একভাবে কাজ করতে হবে।
বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক অধ্যাপক মওদুদ আলমগীর পাভেল বলেন, নারীর নেতৃত্ব বিকাশে বিএনপি সব সময় ইতিবাচক। এইবার সংসদে সাতজন নারী সরাসরি বিজয়ী হয়েছেন, তাঁদের মধ্যে ছয়জন বিএনপির এবং একজন বিএনপির সাবেক কর্মী। তিনি আরও বলেন, নারীকে নাগরিক হিসেবে দেখলে তাঁদের আবেদন অনুকম্পা বা করুণার মতো মনে হবে না। সংরক্ষিত আসনে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে যোগ্য নারীদের মনোনয়ন দেওয়া হবে।
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, দেশে দীর্ঘ ৩০ বছরের মধ্যে মাত্র দুজন নারী ক্ষমতায় ছিলেন। সমস্যা সমাধানে বিদ্যমান কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে এবং স্থানীয় সরকার পর্যায়কে শক্তিশালী করতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নারী সংগঠন ‘নারীশক্তি’র আহ্বায়ক মনিরা শারমিন বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে স্বজন ভাগাভাগি বন্ধ করে যোগ্য নারীদের সংরক্ষিত আসনে মনোনয়ন দিতে হবে। এতে নারীদের জন্য ইতিবাচক প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী তাসনিম জারা বলেন, অনলাইনে সহিংসতা রাজনীতিতে নারীর উপস্থিতি কমিয়ে দেয়। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ সংঘবদ্ধভাবে নারী রাজনীতিকদের সরিয়ে দিচ্ছে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের চিফ অব পার্টি ক্যাথরিন সিসিল বলেন, নারীরা যদি আলোচনার টেবিলে না থাকেন, তবে তাঁদের মূল্যবান দৃষ্টিভঙ্গি হারিয়ে যায়, যা সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণকে প্রভাবিত করে। জুলাইয়ের গণ–আন্দোলনের পর থেকে জনজীবনে যুক্ত হতে নারীর সংখ্যা কমেছে, এর একটি বড় কারণ অনলাইন হয়রানি।
সাইবার হয়রানি বিষয়ে পুলিশের সহকারী মহাপরিদর্শক শামীমা পারভীন বলেন, এ পর্যন্ত ১ লাখ ৭০ হাজার অভিযোগ পাওয়া গেছে, যার ৬০ শতাংশ নারী। ৩ হাজার অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত হয়েছে, রায় হয়েছে মাত্র ৪০টির। প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধ হচ্ছে, তবে পুলিশে জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে।
বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য নিলোফার চৌধুরী মনি বলেন, নির্বাচনে নারীর মনোনয়ন ও সংসদে প্রতিনিধিত্ব বাড়ানোর কথা থাকলেও এখনও তা সীমিত। দলগুলোর মানসিকতা পরিবর্তন করা উচিত, যাতে দীর্ঘদিন রাজপথে থাকা নারী নেত্রীদের সুযোগ দেওয়া হয়।
জামায়াতে ইসলামীর সদস্য মারদিয়া মমতাজ বলেন, নারীর রাজনৈতিক অবস্থান সংক্রান্ত সামাজিক সংস্কার দূর করার দায়িত্ব শুধু নারীর নয়, দলগুলোরও। দলগুলোকে বার্তা দিতে হবে যে নারীর গুরুত্ব রয়েছে।
সংরক্ষিত নারী আসনে বিএনপির দুবারের সংসদ সদস্য রাশেদা বেগম হীরা বলেন, দলগুলো এখনো নির্বাচন কমিশনের শর্ত অনুযায়ী ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে পারেনি। প্রতিটি জেলা ও স্থানীয় কমিটির শীর্ষ তিনটি পদের মধ্যে অন্তত একটি নারী হওয়া উচিত।
নতুন রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম অলটারনেটিভসের সংগঠক তাজনূভা জাবীন বলেন, অনলাইনে নারীর প্রতি সহিংসতা ভয়াবহ, যা দলগুলোকে স্বীকার করতে হবে। দলগুলোকে নারী সমর্থন দিয়ে সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের জ্যেষ্ঠ পরিচালক লিপিকা বিশ্বাস বলেন, নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ শুধুমাত্র সমতার প্রশ্ন নয়, এটি উন্নয়ন ও শক্তিশালী গণতন্ত্রের সুশাসনের শর্ত। ২০২৪ সালের বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নারীদের সমান সুযোগ দিলে জিডিপি ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। ইউএনডিপি তথ্য অনুযায়ী, সংসদে ৩০ শতাংশ নারী থাকলে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু ১৫ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে।
ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের ডেপুটি চিফ অব পার্টি আমিনুল এহসান বলেন, দলের ভিতরে জিততে পারার মতো নারী নেত্রী রয়েছেন, তবে তারা পর্যায়ে এসে আটকে যান। দলগুলোকে এই কাঠামো ভেঙে যোগ্য নারীদের জন্য প্রণোদনা দিতে হবে।
ফ্যাক্ট ওয়াচের গবেষণা সমন্বয়কারী জুলকার নাইন বলেন, অনলাইনে নারীদের আক্রমণ ও অপতথ্য ছড়ানো হয়েছে। নির্বাচনের পর এটি কমলেও উদ্দেশ্য ছিল নারীদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া। দলগুলোকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত।
প্রথম আলোর ইংরেজি ওয়েবের প্রধান আয়েশা কবির বলেন, নারীদের অনলাইনে ভয়াবহভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। হয়রানির ভয়ে মেয়েরা নিজেদের গুটিয়ে নিচ্ছে, অপরাধীরা স্বাধীনভাবে কাজ করছে।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন প্রথম আলোর সহকারী সম্পাদক ফিরোজ চৌধুরী।
সিএ/এমই


