সরকার যদি মব সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারে, তাহলে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে এর প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন।
ধানমন্ডিতে টিআইবি কার্যালয়ে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, মব সন্ত্রাস যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে সেটি অন্য সবকিছুর মতো নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে বাধ্য। এ ক্ষেত্রে সরকারের দায় রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুরু থেকেই সরকার মব সহিংসতা প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় তৎপরতা দেখাতে পারেনি।
মবের উৎপত্তি প্রসঙ্গে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক বলেন, বাংলাদেশে মব সহিংসতার শুরু হয়েছে সরকারের ভেতর থেকেই। দেশের প্রশাসনিক কেন্দ্র সচিবালয়ে প্রথম মবের উৎপত্তি হয়েছিল। এরপর সরকারের বাইরের যেসব শক্তি মব সহিংসতায় জড়িয়েছে, তারা সচিবালয়ে মব সৃষ্টির পরই ক্ষমতায়িত হয়েছে। এর ফলে সরকারের নৈতিক ভিত্তিও দুর্বল হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আর কোনো হত্যাকাণ্ড না হওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, নির্বাচনকেন্দ্রিক সহিংসতা যেন আর না ঘটে। তবে সহিংসতার ঝুঁকি শুধু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়, এর পরবর্তী কয়েক দিনও এই ঝুঁকি থাকতে পারে। সরকার এই বিষয়টি ভালোভাবেই জানে এবং ব্যবস্থা নেওয়ার পূর্ণ ক্ষমতা ও সক্ষমতা তাদের রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
বাংলাদেশের অতীত নির্বাচনী ইতিহাসের কথা উল্লেখ করে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, অতীতের নির্বাচনগুলো থেকে শিক্ষা নিয়ে এবারের নির্বাচনে সহিংসতা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে।
জুলাই-পরবর্তী জবাবদিহির প্রক্রিয়া নিয়েও উদ্বেগ জানান ড. ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, জুলাই আন্দোলনের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ঢালাওভাবে মামলায় জড়িয়ে সাংবাদিকদের আটক রাখা হয়েছে। পেশাগত অবস্থান অপব্যবহারের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে নেওয়া এই পদক্ষেপ কতটুকু বিচার আর কতটুকু প্রতিশোধ, সে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে। এর ফলে প্রকৃত অপরাধী ও কর্তৃত্ববাদের দোসরদের চিহ্নিত করে জবাবদিহির আওতায় আনা কতটা সম্ভব ও গ্রহণযোগ্য হবে, সে বিষয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হলে হত্যা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, দুর্নীতি, অর্থ পাচার ও কর ফাঁকির মতো অপরাধের সঙ্গে জড়িত প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে ন্যায়সংগত ও বিশ্বাসযোগ্য বিচার নিশ্চিত করতে হবে বলে মত দেন তিনি।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনীতিবিদ ও আমলাতন্ত্র জুলাই আন্দোলন থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি। তারা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। এ কারণে ঐকমত্য কমিশনে জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকারব্যবস্থার যে পদ্ধতিগুলো উপস্থাপন করা হয়েছিল, প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের আপত্তি ছিল।
নোট অব ডিসেন্টের মৌলিক ধারণা মেনে নিলে আপত্তি থাকলেও যেসব বিষয়ে ঐকমত্য বা সিদ্ধান্ত হয়েছে, সেটিই বাস্তবায়িত হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতকে প্রাধান্য দেওয়ার রীতি বিশ্বব্যাপী প্রচলিত থাকলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটি কতটা কার্যকর হবে, তা দেখার বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি। গণভোটের রায় ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে গেলে সংস্কার বাস্তবায়ন সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করবে বলেও তিনি জানান।
সরকারের সম্প্রচার কমিশন অধ্যাদেশ ও গণমাধ্যম কমিশন অধ্যাদেশ নিয়েও সমালোচনা করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, গণমাধ্যমকে বিশেষভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে এবং মিডিয়ার জন্য নতুন ঝুঁকি সৃষ্টি করা হয়েছে। সরকারের ভেতরের ও বাইরের শক্তি এতে ভূমিকা রেখেছে এবং বাইরের শক্তিকে সরকারই অতিক্ষমতায়িত করেছে।
গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে ও নিরাপদ পরিবেশে পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর মতে, দুটি মিডিয়া কমিশন লোকদেখানো পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছু নয়।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিচারক নিয়োগ কমিটি ও স্বাধীন বিচার বিভাগ সচিবালয়ের মতো কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তবে এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকর হবে, তার জবাব পরবর্তী সরকারকে দিতে হবে। একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার ভেতরে দলীয়করণ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
গণতান্ত্রিক সংস্কার সফল করতে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনীতিমুক্ত করার বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দৃঢ় অঙ্গীকার প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক।
সিএ/এমই


