Tuesday, March 10, 2026
29.9 C
Dhaka

ইতিহাসের পাতায় ২৩ শে জুন

হাসান ইনাম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম ‘পলাশী’। পলাশী নামটি এসেছে লাল রঙের ফুল পলাশ থেকে। ‘পলাশী’ শব্দটা শুনলেই অবচেতন মনে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একই সাথে বেশ কয়েকটা নাম – নবাব সিরাজোদ্দৌলা, রবার্ট ক্লাইভ, মীর জাফর। ১৭৫৭ সালের আজকের এইদিনে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের মুখোমুখি হন বাংলার শেষ নবাব সিরাজোদ্দৌলা। ইংরেজ বাহিনীর ছিলো – ইউরোপীয় সৈন্য ২,১০০ জন ভারতীয় সিপাহি ১০০ বন্দুকবাজ, ৯টি কামান (আটটি ৬ পাউন্ডার ও একটি হাওইটজার) অপরদিকে নবাবের পক্ষে ছিলো প্রাথমিকভাবে ৫০,০০০ সৈন্য আর ৫৩টি কামান।

যুদ্ধের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তাঁর প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লুৎফ খান ও রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীর মদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীর মদন এবং অপর সেনাপতি মোহন লাল ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীর মদন মারাত্মকভাবে আহত হন ও মারা যান। নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খান প্রমুখ গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধানও একইসাথে মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধের এই পরিস্থিতে নবাব তার দুই সেনাপতি মীর জাফর ও রায় দূর্লভকে তাদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা উভয়ই অযুহাত দেখিয়ে নবাবের নির্দেশ অমান্য করেন। তাদের অযুহাত ছিলো গোলান্দাজ বাহিনীর সাহায্য ছাড়া সামনে অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।

যুদ্ধের এমন পরিস্থিতে সেনাপতি মীর জাফর এবং তার সহযোগীরা নবাবকে যুদ্ধ বিরতি করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লাল নবাবকে পরামর্শ দেন যুদ্ধবিরতি ঘটলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সিরাজ মীর জাফর এবং তার সহযোগীদের পরামর্শে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। বিকেল পাঁচটায় সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার করে। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপীয় এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য ২,০০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। সিরাজউদ্দৌলা তাঁর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে পদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সেনাপতি মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রাজা রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তাঁর সে আশা পূর্ণ হয়নি। সিরাজ পথিমধ্যে বন্দি হন ও মিরনের হাতে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।

নবাবের মৃত্যুর পর ইংরেজরা মীর জাফর আলী খানকে সিংহসনে বসায়। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতকের সিংহাসন সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ইংরেজদের সাথে চুক্তিনামা রক্ষা করতে না পারায় তাকেও সিংসাহনচ্যুত হতে হয়।
তথ্যসূত্র – *উইকিপিডিয়া *রজতকান্ত রায় (১৯৯৪)। পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
spot_img

আরও পড়ুন

ইফতারের শরবতে চিনি না গুড়—কোনটি স্বাস্থ্যকর

রমজান মাসে ইফতারের সময় খেজুরের পাশাপাশি শরবত পান করা...

চার শতকের পুরোনো মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন

কুমিল্লা মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শাহ সুজা মসজিদ...

সুনামগঞ্জে এক জমিতে ৫১ জাতের ধান

সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে কৃষকদের ধানের বৈচিত্র্যময় জাত সম্পর্কে ধারণা...

এআই প্রযুক্তিতে বদলে যেতে পারে স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহারের ধরণ

স্মার্টফোন এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন...

আইফোনের লোভে বন্ধুর হাতে কলেজছাত্র খুন

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলায় আইফোন ও নগদ টাকার লোভে এক...

চিফ হুইপের সঙ্গে বিরোধী দলের বৈঠক

বিরোধী দলের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে জাতীয় সংসদের কার্যক্রমকে...

ফেসবুক পোস্ট নিয়ে শাবিপ্রবির নতুন নীতিমালা

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়—এমন কোনো পোস্ট করলে...

নয়াপাড়ায় পারিবারিক দ্বন্দ্বে বৃদ্ধের মৃত্যু

কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলায় সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে বাবাকে পিটিয়ে...

এক বছরে তিন ঈদ, ২০৩৯ সালে ঘটতে যাচ্ছে বিরল ঘটনা

মহাজাগতিক ও চন্দ্র ক্যালেন্ডারের বিশেষ বিন্যাসের কারণে ২০৩৯ সালে...

ফিলিং স্টেশনে ভিড়ের প্রয়োজন নেই: প্রতিমন্ত্রী

দেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে ফিলিং স্টেশনে...

নাটোরে কলাবাগান কেটে ফেলার অভিযোগ

নাটোরের লালপুর উপজেলায় এক স্বতন্ত্র প্রার্থীর কর্মীর কলাবাগানের ১৫২টি...

ঈদযাত্রায় দুর্ঘটনা রোধে ৯ দফা প্রস্তাব

ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর দেশের মহাসড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়ে...

কুড়িগ্রামে বিনা লাভের বাজারে ক্রেতাগণের স্বস্তি

বিনা লাভের বাজারে পণ্য ক্রয় করে মো. রওশন বলেন,...

কিডনিতে পাথর জমার সঙ্গে কি চায়ের সম্পর্ক আছে

বাংলাদেশসহ উপমহাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনে চা একটি অত্যন্ত জনপ্রিয়...
spot_img

আরও পড়ুন

ইফতারের শরবতে চিনি না গুড়—কোনটি স্বাস্থ্যকর

রমজান মাসে ইফতারের সময় খেজুরের পাশাপাশি শরবত পান করা অনেকেরই নিয়মিত অভ্যাস। সাধারণত এসব শরবত তৈরিতে সাদা চিনি ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মিষ্টিজাতীয় বিভিন্ন...

চার শতকের পুরোনো মোগল স্থাপত্যের নিদর্শন

কুমিল্লা মহানগরীর মোগলটুলী এলাকায় অবস্থিত ঐতিহাসিক শাহ সুজা মসজিদ মোগল আমলের স্থাপত্য ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। ভারতীয় উপমহাদেশের শাসক সম্রাট আওরঙ্গজেবের ভাই...

সুনামগঞ্জে এক জমিতে ৫১ জাতের ধান

সুনামগঞ্জের হাওর অঞ্চলে কৃষকদের ধানের বৈচিত্র্যময় জাত সম্পর্কে ধারণা দিতে এক জমিতে ৫১ জাতের ধানের আবাদ করা হয়েছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) এই...

এআই প্রযুক্তিতে বদলে যেতে পারে স্মার্টফোন অ্যাপ ব্যবহারের ধরণ

স্মার্টফোন এখন কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি অপরিহার্য প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে। গান শোনা, ছবি তোলা, ইমেইল দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার...
spot_img