Thursday, January 22, 2026
18 C
Dhaka

ইতিহাসের পাতায় ২৩ শে জুন

হাসান ইনাম

ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরের প্রায় ৫০ কিলোমিটার উত্তরে ভাগীরথী নদীর তীরে অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম ‘পলাশী’। পলাশী নামটি এসেছে লাল রঙের ফুল পলাশ থেকে। ‘পলাশী’ শব্দটা শুনলেই অবচেতন মনে চোখের সামনে ভেসে ওঠে একই সাথে বেশ কয়েকটা নাম – নবাব সিরাজোদ্দৌলা, রবার্ট ক্লাইভ, মীর জাফর। ১৭৫৭ সালের আজকের এইদিনে পলাশীর আম্রকাননে ইংরেজদের মুখোমুখি হন বাংলার শেষ নবাব সিরাজোদ্দৌলা। ইংরেজ বাহিনীর ছিলো – ইউরোপীয় সৈন্য ২,১০০ জন ভারতীয় সিপাহি ১০০ বন্দুকবাজ, ৯টি কামান (আটটি ৬ পাউন্ডার ও একটি হাওইটজার) অপরদিকে নবাবের পক্ষে ছিলো প্রাথমিকভাবে ৫০,০০০ সৈন্য আর ৫৩টি কামান।

যুদ্ধের শুরুর দিকে হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজ বাহিনীকে আক্রমণ করেন। তাঁর প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। মীর মদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীর জাফর, ইয়ার লুৎফ খান ও রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্য সমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন। তাঁদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীর মদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন। দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজউদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীর মদন এবং অপর সেনাপতি মোহন লাল ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীর মদন মারাত্মকভাবে আহত হন ও মারা যান। নবে সিং হাজারী ও বাহাদুর খান প্রমুখ গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধানও একইসাথে মৃত্যুবরণ করেন। যুদ্ধের এই পরিস্থিতে নবাব তার দুই সেনাপতি মীর জাফর ও রায় দূর্লভকে তাদের অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার নির্দেশ দেন। কিন্তু তারা উভয়ই অযুহাত দেখিয়ে নবাবের নির্দেশ অমান্য করেন। তাদের অযুহাত ছিলো গোলান্দাজ বাহিনীর সাহায্য ছাড়া সামনে অগ্রসর হওয়া আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হবে।

যুদ্ধের এমন পরিস্থিতে সেনাপতি মীর জাফর এবং তার সহযোগীরা নবাবকে যুদ্ধ বিরতি করার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু বিশ্বস্ত সেনাপতি মোহন লাল নবাবকে পরামর্শ দেন যুদ্ধবিরতি ঘটলে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী। কিন্তু সিরাজ মীর জাফর এবং তার সহযোগীদের পরামর্শে পশ্চাৎপসরণের সিদ্ধান্ত নেন। বিকেল পাঁচটায় সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী নির্দেশনার অভাবে এবং ইংরেজ বাহিনীর গোলন্দাজি অগ্রসরতার মুখে যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করে অর্থাৎ পরাজয় স্বীকার করে। নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে ৭ জন ইউরোপীয় এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। তখন কোনো উপায় না দেখে সিরাজউদ্দৌলা রাজধানী রক্ষা করার জন্য ২,০০০ সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যেও কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। সিরাজউদ্দৌলা তাঁর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে পদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সেনাপতি মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রাজা রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন। কিন্তু তাঁর সে আশা পূর্ণ হয়নি। সিরাজ পথিমধ্যে বন্দি হন ও মিরনের হাতে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু ঘটে।

নবাবের মৃত্যুর পর ইংরেজরা মীর জাফর আলী খানকে সিংহসনে বসায়। কিন্তু এই বিশ্বাসঘাতকের সিংহাসন সুখ বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। ইংরেজদের সাথে চুক্তিনামা রক্ষা করতে না পারায় তাকেও সিংসাহনচ্যুত হতে হয়।
তথ্যসূত্র – *উইকিপিডিয়া *রজতকান্ত রায় (১৯৯৪)। পলাশীর ষড়যন্ত্র ও সেকালের সমাজ। কলকাতা: আনন্দ পাবলিশার্স।
spot_img

আরও পড়ুন

সাত আসমান কি বায়ুমণ্ডল নাকি মহাবিশ্ব

সৃষ্টিজগতের বিশালতা ও রহস্য মানুষের কৌতূহলকে চিরকাল আকৃষ্ট করে...

ইলেকট্রিক ব্রাশ ব্যবহারে দাঁতের যত্ন কতটা কার্যকর

ইলেকট্রিক টুথব্রাশের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুরা...

শব্দের কম্পাঙ্কে আলঝেইমার চিকিৎসার নতুন দিগন্ত

আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন চীনের কুনমিং...

জেনে নিন: কেন জেন-জি প্রজন্ম চাকরি থেকে বাদ পড়ছে

জেন-জি প্রজন্মের কাছে চাকরি মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়;...

যোগ্য নেতৃত্ব ছাড়া ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান টেকসই নয়

ব্রিটেনজুড়ে গত দুই দশকে গড়ে উঠেছে আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর অসংখ্য...

খেজুর গুড়ের ক্ষীরের রেসিপি

মাঝরাতে যদি হঠাৎ মিষ্টির মন চায়, তাহলে বাজারের মিষ্টি...

জীবন বদলে দিতে এবার নিজেকে গ্রহণ করুন

আপনি কি প্রায়ই অন্যের সঙ্গে নিজেকে তুলনা করেন? বন্ধু,...

ওরাল ক্যানসারের লক্ষণ ও সতর্কতা

বিশ্বব্যাপী উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে ওরাল বা মুখগহ্বরের ক্যানসার। বাংলাদেশেও...

৭ সেকেন্ডে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ বন্ধ—নাসার স্পষ্ট ব্যাখ্যা

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি দাবি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে যে...

রমজানের প্রস্তুতিতে শাবানের তাৎপর্য

ইসলামি বর্ষপঞ্জির অষ্টম মাস শাবান শুরু হয়েছে। এই মাসটি...

ইউরিন টেস্টের আগে যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

বিভিন্ন রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা প্রায়ই প্রস্রাব পরীক্ষা করতে...

গবেষণায় ধরা পড়ল উদ্ভিদের শ্বাসপ্রক্রিয়ার ভিডিও

উদ্ভিদ যে পাতার ক্ষুদ্র ছিদ্রের মাধ্যমে শ্বাস নেয়, তা...

ইসলামে নেতৃত্ব ও সহযোগিতার শিক্ষা

আধুনিক করপোরেট জগৎ কিংবা সামাজিক সংগঠনে সাফল্যের অন্যতম চাবিকাঠি...

শিশুদের শ্বাসকষ্ট হলে কী করণীয়

শ্বাস নিতে গেলে দম আটকে আসার মতো সমস্যা কখনোই...
spot_img

আরও পড়ুন

সাত আসমান কি বায়ুমণ্ডল নাকি মহাবিশ্ব

সৃষ্টিজগতের বিশালতা ও রহস্য মানুষের কৌতূহলকে চিরকাল আকৃষ্ট করে এসেছে। ইসলামি ধর্মতত্ত্বে ‘সাত আসমান’ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক ধারণা। পবিত্র কোরআনের একাধিক আয়াত এবং...

ইলেকট্রিক ব্রাশ ব্যবহারে দাঁতের যত্ন কতটা কার্যকর

ইলেকট্রিক টুথব্রাশের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে শিশুরা একবার ইলেকট্রিক ব্রাশ ব্যবহার করলে সাধারণ ব্রাশে ফিরতে চায় না। প্রশ্ন হচ্ছে, ইলেকট্রিক টুথব্রাশ কি...

শব্দের কম্পাঙ্কে আলঝেইমার চিকিৎসার নতুন দিগন্ত

আলঝেইমার রোগের চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন চীনের কুনমিং ইনস্টিটিউট অব জুলোজির একদল গবেষক। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, বিশেষ কম্পাঙ্কের শব্দ ব্যবহার করে আলঝেইমার...

জেনে নিন: কেন জেন-জি প্রজন্ম চাকরি থেকে বাদ পড়ছে

জেন-জি প্রজন্মের কাছে চাকরি মানে শুধু অর্থ উপার্জন নয়; তারা ৯ টা-৫টার নিয়মে আবদ্ধ থাকতে চায় না। বিশেষ করে ফ্রিল্যান্স বা স্বাধীনভাবে কাজ করার...
spot_img