পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম অনুযায়ী কোনো বস্তুকে তাপ দিলে সাধারণত তার তাপমাত্রা বাড়ে। তবে কিছু বিশেষ অবস্থায় দেখা যায়, দীর্ঘ সময় তাপ দেওয়ার পরও তাপমাত্রা একই অবস্থায় স্থির থাকে। বিষয়টি অস্বাভাবিক মনে হলেও প্রকৃতিতে এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনা। মূলত পদার্থের অবস্থা পরিবর্তনের সময় এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়।
কঠিন পদার্থের অণুগুলো সাধারণ অবস্থায় শক্তিশালী আন্তঃআণবিক বন্ধনের মাধ্যমে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত থাকে। যখন কোনো কঠিন পদার্থে তাপ দেওয়া হয়, তখন অণুগুলো ধীরে ধীরে শক্তি সঞ্চয় করে। নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় পৌঁছানোর পর সেই শক্তি আন্তঃআণবিক বন্ধন দুর্বল করতে শুরু করে। একসময় বন্ধন ভেঙে অণুগুলো তুলনামূলক স্বাধীনভাবে চলাচল করতে পারে। তখন কঠিন পদার্থ গলে তরলে পরিণত হয়।
বরফের উদাহরণ দিয়ে বিষয়টি সহজে বোঝা যায়। সাধারণ চাপে ০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় বরফ গলতে শুরু করে। যদি -২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার বরফকে ধীরে ধীরে উত্তপ্ত করা হয়, তাহলে প্রথমে তার তাপমাত্রা বাড়বে। কিন্তু ০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পর ভিন্ন ঘটনা ঘটবে। তখন তাপ দেওয়া চললেও থার্মোমিটারের পারদ আর ওপরে উঠবে না।
এর কারণ, এই সময় সরবরাহ করা তাপ বরফের তাপমাত্রা বাড়ানোর বদলে অণুগুলোর আন্তঃআণবিক বন্ধন ভাঙতে ব্যয় হয়। ফলে বরফ ধীরে ধীরে পানিতে রূপ নিতে থাকে। পুরো বরফখণ্ড গলে তরলে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা একই থাকে।
পদার্থবিজ্ঞানে এই অতিরিক্ত তাপশক্তিকে বলা হয় গলনের সুপ্ততাপ। অর্থাৎ যে তাপ বস্তুর তাপমাত্রা না বাড়িয়ে অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়, সেটিই সুপ্ততাপ।
একই ধরনের ঘটনা পানির বাষ্পীভবনের সময়ও দেখা যায়। বরফ সম্পূর্ণ গলে পানিতে পরিণত হওয়ার পর তাপ দিতে থাকলে পানির তাপমাত্রা আবার বাড়তে থাকে। ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালে পানি ফুটতে শুরু করে। কিন্তু তখনও তাপ দিলেও তাপমাত্রা আর বাড়ে না।
এই পর্যায়ে তাপশক্তি পানির অণুগুলোকে সম্পূর্ণভাবে বাষ্পে রূপান্তর করতে ব্যবহৃত হয়। সব পানি বাষ্পে পরিণত না হওয়া পর্যন্ত তাপমাত্রা ১০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসেই স্থির থাকে। এই অতিরিক্ত তাপকে বলা হয় বাষ্পীভবনের সুপ্ততাপ।
তবে পুরো প্রক্রিয়াটি যদি খোলা পাত্রে করা হয়, তাহলে বাষ্প বাতাসে মিশে যায়। আর আবদ্ধ পাত্রে করা হলে বাষ্প বের হতে পারে না। তখন আরও তাপ দিলে বাষ্পের তাপমাত্রাও বাড়তে শুরু করে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সুপ্ততাপের পরিমাণ বস্তু ও তার ভরের ওপর নির্ভর করে। বরফ, লোহা কিংবা স্বর্ণ—প্রতিটি পদার্থের সুপ্ততাপ আলাদা। একই সঙ্গে বেশি ভরের পদার্থ গলাতে বা বাষ্পে পরিণত করতে বেশি তাপ প্রয়োজন হয়।
সূত্র: বিজ্ঞানবিষয়ক প্রতিবেদন
সিএ/এমআর


