কনটেইনারবাহী জাহাজ ডুবির ঘটনায় থাইল্যান্ড থেকে ৮২ দিন পর দেশে ফেরা ১৫ বাংলাদেশি নাবিক। ছবি : সংগৃহীত
নীল সমুদ্রের শান্ত দৃশ্য এক মুহূর্তেই রূপ নেয় ভয়াবহ বিপর্যয়ে। গত ৭ ফেব্রুয়ারি মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেছিল কনটেইনারবাহী জাহাজ ‘এমভি সীলয়েড আর্ক’। কিন্তু থাইল্যান্ডের ফুকেট উপকূল থেকে মাত্র ৪ নটিক্যাল মাইল দূরে হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অতল সমুদ্রে তলিয়ে যায় জাহাজটি।
সেই দুর্ঘটনায় প্রাণ হারানোর শঙ্কায় পড়ে যান ১৬ জন বাংলাদেশি নাবিক। তবে থাই নৌবাহিনীর দ্রুত অভিযানে সবাইকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়। এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, প্রশাসনিক জটিলতা এবং দেশে ফেরার অপেক্ষার কঠিন দিনগুলো।
টানা ৮২ দিন ধরে থাইল্যান্ডে আটকে থাকেন নাবিকরা। আইনি অনুমোদন ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতায় তাদের দেশে ফেরানো সম্ভব হচ্ছিল না। অবশেষে বৃহস্পতিবার ( ৫ ডিসেম্বর) দুপুরে ইন্ডিগো এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তারা ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।
বিমানবন্দরে নামার মুহূর্তে নাবিকদের চোখে ছিল দীর্ঘ প্রতীক্ষার স্বস্তি আর আবেগ। পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে যাওয়ার আনন্দে অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
দুর্ঘটনার দিন জাহাজটিতে ১০১টি বড় এবং ৯৬টি ছোট কনটেইনার ছিল। উত্তাল সমুদ্রে ভারসাম্য হারিয়ে অল্প সময়ের মধ্যেই ডুবে যায় ‘এমভি সীলয়েড আর্ক’। তবে থাই নৌবাহিনীর দ্রুত উদ্ধার অভিযানে নাবিকদের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হয়।
উদ্ধারের পরও তাদের দেশে ফেরা ছিল অনিশ্চিত। থাইল্যান্ডের আইনগত জটিলতা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় দীর্ঘ সময় আটকে থাকেন তারা। এ সময় নাবিকদের পাশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএমওএ)।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘নাবিকদের দেশে ফেরা আমাদের জন্য এক পরম স্বস্তির বিষয়। আমরা সরাসরি ইন্টারন্যাশনাল ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের (আইটিএফ) সাথে যোগাযোগ করেছি, যাতে আন্তর্জাতিকভাবে চাপ তৈরি করা যায়।’
নাবিকদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় সমন্বয় করেছে জাহাজের টেকনিক্যাল ম্যানেজার নাফ মেরিন সার্ভিসেস। পাশাপাশি থাইল্যান্ডে বাংলাদেশ দূতাবাস ও নৌপরিবহন অধিদপ্তরও সক্রিয় ভূমিকা রাখে।
আইনি সহায়তায় ‘Rajah & Tann’, লজিস্টিক ব্যবস্থাপনায় ‘বেন লাইন এজেন্সিস’ এবং বিমা সংক্রান্ত সহযোগিতায় ‘পিঅ্যান্ডআই ক্লাব’ কাজ করে। জাহাজ মালিক কর্তৃপক্ষও নাবিকদের থাকা-খাওয়া ও বেতন নিশ্চিত করে মানবিক ভূমিকা রাখে।
তবে ১৬ জনের মধ্যে জাহাজের মাস্টার এখনো থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। কিছু আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় তাকে আরও কিছুদিন সেখানে থাকতে হবে বলে জানা গেছে।
বিএমএমওএ জানিয়েছে, বাংলাদেশের নাবিকরা দেশের গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। যেকোনো দুর্যোগে তাদের পাশে থাকা সংগঠনের অগ্রাধিকার থাকবে।
ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে শুরু করে ৮২ দিনের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে অবশেষে দেশে ফেরা নাবিকদের জীবনে এখন শুধু স্বস্তি আর পরিবারের কাছে ফেরার আনন্দ।
সিএ/এমই


