বিশ্বজুড়ে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ায় বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তেল ও গ্যাসের সরবরাহ ও দামের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে বিভিন্ন দেশের জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ বাড়ায় সরকার ও সাধারণ মানুষ উভয়ের কাছেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন বড় একটি লক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাসা বা অফিসে কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বিদ্যুতের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। বিশেষ করে গরমের সময় এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম মেনে চললে বিদ্যুৎ বিল কমানো যায় এবং একই সঙ্গে বিদ্যুৎ সাশ্রয়ও হয়।
এসি ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নির্ধারণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকেই মনে করেন এসির তাপমাত্রা ১৬ বা ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখলে ঘর দ্রুত ঠান্ডা হয়। বাস্তবে এতে বিদ্যুতের খরচ অনেক বেড়ে যায়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসির তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে রাখা সবচেয়ে উপযোগী। এতে ঘর আরামদায়ক থাকে এবং বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম হয়।
একটি সাধারণ হিসাব অনুযায়ী, এসির তাপমাত্রা প্রতি এক ডিগ্রি কমালে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ প্রায় ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি কম তাপমাত্রা নির্ধারণ করলে বিদ্যুৎ বিল দ্রুত বাড়ে।
এসি চালু থাকলেও সিলিং ফ্যান ব্যবহার করা একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। ফ্যান চালু থাকলে ঠান্ডা বাতাস দ্রুত ঘরের চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং এসিকে অতিরিক্ত কাজ করতে হয় না। অনেকের ধারণা এতে বিদ্যুৎ বেশি খরচ হয়, কিন্তু বাস্তবে একটি ফ্যান যে পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহার করে, একটি এসি তার চেয়ে অনেক বেশি বিদ্যুৎ খরচ করে। ফলে দুটি একসঙ্গে ব্যবহার করলে অনেক সময় মোট বিদ্যুৎ খরচ কমে যায়।
এসি চালানোর সময় ঘরের দরজা ও জানালা বন্ধ রাখা জরুরি। দরজা বা জানালা খোলা থাকলে ঠান্ডা বাতাস বাইরে চলে যায় এবং ঘর ঠান্ডা রাখতে এসিকে বেশি সময় কাজ করতে হয়। এর ফলে বিদ্যুৎ ব্যবহারও বাড়ে। দিনের বেলায় সরাসরি রোদ যাতে ঘরে না ঢোকে, সে জন্য পর্দা ব্যবহার করাও উপকারী হতে পারে।
অনেক সময় ঘুমিয়ে পড়ার পরও এসি দীর্ঘ সময় একই তাপমাত্রায় চলতে থাকে। অথচ গভীর রাতে আবহাওয়া স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা ঠান্ডা হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে এসির টাইমার বা স্লিপ মোড ব্যবহার করলে নির্দিষ্ট সময় পর তাপমাত্রা ধীরে ধীরে বাড়ে বা এসি বন্ধ হয়ে যায়, যা বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে সহায়ক।
এসি দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করলে ফিল্টার ও কনডেন্সারে ধুলা জমে যায়। এতে বাতাস চলাচল কমে এবং যন্ত্রটিকে বেশি শক্তি খরচ করতে হয়। তাই বিশেষজ্ঞরা বছরে অন্তত এক বা দুইবার এসি সার্ভিসিং করার পরামর্শ দেন। এতে যন্ত্রটি কার্যকর থাকে এবং বিদ্যুতের ব্যবহারও কম হয়।
নতুন এসি কেনার ক্ষেত্রে ইনভার্টার প্রযুক্তির এসি বিবেচনা করা যেতে পারে। এ ধরনের এসি ঘরের তাপমাত্রা অনুযায়ী কম্প্রেসরের গতি নিয়ন্ত্রণ করে, ফলে বিদ্যুতের ব্যবহার তুলনামূলক কম হয়।
শুধু এসি নয়, বাসা বা অফিসে ব্যবহৃত অন্যান্য যন্ত্র থেকেও অনেক সময় বিদ্যুতের অপচয় হয়। অপ্রয়োজনে বাতি জ্বালিয়ে রাখা, টেলিভিশন চালু রাখা বা চার্জার প্লাগে লাগিয়ে রাখার মতো ছোট ছোট বিষয়েও বিদ্যুৎ নষ্ট হয়। এসব অভ্যাস পরিবর্তন করলে মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারে উল্লেখযোগ্য সাশ্রয় করা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বিদ্যুৎ সাশ্রয় এখন শুধু বিল কমানোর বিষয় নয়, এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দায়িত্বও। সামান্য সচেতনতা ও কিছু সহজ অভ্যাস পরিবর্তনের মাধ্যমে বাসা বা অফিসে বিদ্যুতের অপচয় অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সিএ/এমআর


