মহান শহীদ দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের প্রেক্ষাপটে ভাষার মর্যাদা ও সাংস্কৃতিক পরিচয় নতুন করে উচ্চারিত হলেও বাস্তবতা বেশ ভিন্ন। দেশের বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী বাংলা ও ইংরেজি—দুই ভাষাতেই প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন না করেই এক শ্রেণি থেকে আরেক শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করার পরও ভাষাজ্ঞানে পিছিয়ে থাকে। তারা ভালো বাংলা লিখতে পারে না এবং ইংরেজিতেও দক্ষ হতে পারছে না। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষাজীবন এবং চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে। সংকটের মূল শুরু প্রাথমিক শিক্ষা থেকেই।
২০২৩ সালে সেভ দ্য চিলড্রেন ও গণসাক্ষরতা অভিযান কুড়িগ্রামের রাজারহাট ও জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার ৩২২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২ হাজার ২৯ শিক্ষার্থীর ওপর গবেষণা চালিয়ে দেখেছে, শিক্ষার্থীরা যত ওপরে উঠে, ভাষাশিক্ষার ঘাটতিও তত বাড়ছে। প্রথম শ্রেণিতে বাংলা বিষয়ে শিক্ষার্থীদের ১৯ শতাংশের শিখন ঘাটতি থাকলেও পঞ্চম শ্রেণিতে তা বেড়ে প্রায় ৭০ শতাংশে দাঁড়ায়। ইংরেজিতে অবস্থা আরও খারাপ; পঞ্চম শ্রেণিতে প্রায় ৮২ শতাংশ শিক্ষার্থীর ঘাটতি ধরা পড়ে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাষাশিক্ষায় দুর্বলতা এখন বিচ্ছিন্ন সমস্যা নয়; এটি প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত কাঠামোগত সংকটে রূপ নিয়েছে। সচ্ছল পরিবারের শিশুরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাইরে ভাষা ও যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করছে, তবে অসচ্ছল পরিবারের শিশুরা বঞ্চিত হচ্ছে। শিক্ষক ও সংশ্লিষ্টরা জানান, শিক্ষাব্যবস্থায় ভাষা শিক্ষার ব্যবস্থা থাকলেও তা যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয় না। বিভিন্ন সময়ে সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও ধারাবাহিকতা নেই, ফলে সমস্যা প্রকট হচ্ছে।
গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধূরী বলেন, ভাষাদক্ষতা শিক্ষার্থীর সুযোগের দরজা খুলে দেয়। প্রাথমিক স্তর থেকেই পরিকল্পিতভাবে এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। তিনি মনে করেন, সমস্যার সমাধান কঠিন নয়, প্রয়োজন যথাযথ উদ্যোগ ও বাস্তবায়ন।
সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের ২০২২ সালের জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়নের প্রতিবেদনে দেখা যায়, তৃতীয় শ্রেণির ৫১ শতাংশ এবং পঞ্চম শ্রেণির ৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী বাংলায় কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। বেসরকারি সংগঠন ওয়েভ ফাউন্ডেশনের ২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, ৫–১৬ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ শতাংশের বেশি ছেলে ও ৯ শতাংশ মেয়ে বাংলার বর্ণও পড়তে পারেনি। ইংরেজিতে পরিস্থিতি আরও খারাপ; ১৬.৭৮ শতাংশ ছেলে এবং ১৫.২২ শতাংশ মেয়ে বর্ণ পড়তে পারেনি।
শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের দুরবস্থা এবং কোচিং-টিউশনের প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে। শেওড়াপাড়ার এক অভিভাবক জানান, তিনি নিজের দ্বিতীয় শ্রেণির সন্তানকে বাসায় বাংলা শেখান গৃহশিক্ষক দ্বারা এবং ইংরেজি শেখানোর জন্য অনলাইন কোর্সে ভর্তি করেছেন, খরচ প্রতি মাসে ছয় হাজার টাকা। তিনি বলেন, স্কুলে পরীক্ষা নেওয়ার বাইরে কার্যকরভাবে ভাষা শেখানো হয় না।
ভাষাজ্ঞানের অভাবে শিক্ষার্থীরা সরকারি চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় পিছিয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর শেষ এক শিক্ষার্থী জানান, এখন নতুন করে শিখতে হচ্ছে কারণ আগের শিক্ষাজ্ঞান অপর্যাপ্ত ছিল। বিপিএটিসির সাবেক রেক্টর এ কে এম আবদুল আউয়াল মজুমদারও বলেন, সরকারি চাকরিতে ভাষাজ্ঞান না থাকলে চাকরি পাওয়া কঠিন, এবং কাজের সময়ও অনেকে বেকায়দায় পড়েন।
নতুন সরকারের শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানিয়েছেন, বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি ধাপে ধাপে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা আরবি, চীনা, জাপানি বা ফরাসি ভাষা শিখবে, যা শুধুমাত্র পড়ালেখা নয়, শোনা ও বলাও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
উদয়ন উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ জহুরা বেগম বলেন, শিক্ষার্থীদের ভাষাদক্ষতা দূর করতে শিক্ষকের সঙ্গে শিক্ষার্থীর যোগাযোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার প্রশ্ন ও পাঠ্যসূচিতে পরিবর্তন আনা, মুখস্থ নয় নিজের মতো লিখতে উৎসাহ দেওয়া এবং বিতর্ক, গল্প বলা ও বক্তৃতার মতো সহশিক্ষা কার্যক্রম বৃদ্ধি করা জরুরি।
সিএ/এমই


