১৯১৬ সালের শীতকালে, ইউরোপে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মাঝেই মানুষের জীবন নিক্ষিপ্ত করেছিল এক অদ্ভুত নতুন রোগ। ইনফ্লুয়েঞ্জা মহামারির সঙ্গে প্রায় একই সময়ে দেখা দেয় এই রহস্যময় রোগ, যা পরবর্তীতে পরিচিত হয় এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা বা ঘুমের রোগ হিসেবে। এতে আক্রান্ত রোগীরা প্রথমে জ্বরে ভুগে, তারপর একসময় গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় এবং কেউ কেউ আর জাগতে পারে না। যারা বেঁচে থাকত, তারা পরিণত হতো জীবন্ত মূর্তিতে।
ভিয়েনার সাইকিয়াট্রিক-নিউরোলজিক্যাল ক্লিনিকে ডাক্তার কনস্ট্যান্টিন ভন ইকোনোমো এই রোগ শনাক্ত করেন। তার পর্যবেক্ষণে দেখা যায় রোগীদের অন্যতম সাধারণ লক্ষণ ছিল প্রচণ্ড ঘুম বা তন্দ্রাচ্ছন্নতা। তিনি রোগটিকে এনসেফালাইটিস লিথার্জিকা নাম দেন। রোগটি প্রাথমিকভাবে ফ্লু-এর মতো হালকা জ্বর, মাথা ব্যথা, কাঁপুনি ও বমির মাধ্যমে শুরু হলেও, দ্রুত ভয়ঙ্কর রূপ নিত।
রোগের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ ছিল সমিনোলেন্ট-অফথালমোপ্লিজিক, যেখানে রোগীরা দীর্ঘ সময় ধরে ঘুমাত এবং সচেতন থাকলেও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাত না। নিউরোলজিস্ট অলিভার স্যাক্স তাঁর বই অ্্যাওয়েকেনিংসে বর্ণনা করেছেন, রোগীরা সচেতন থাকলেও অশরীরী হয়ে থাকত। নতুন ধরনের রূপে ইনসোমনিয়া ও প্রচণ্ড ব্যথা যুক্ত হয়, যেখানে মরফিনেও ব্যথা কমানো যেত না।
রোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও ভয়াবহ ছিল। যারা প্রাথমিক ধাক্কা সামলে বেঁচে যেত, তাদের মধ্যে অনেকেই পরে পারকিনসন্স রোগের মতো লক্ষণ দেখা যেত। আধুনিক গবেষকরা মনে করেন, এর পেছনে এন্টেরোভাইরাস গোত্রের কোনো ভাইরাস দায়ী হতে পারে, যা আক্রান্তের কফ বা থুথুর মাধ্যমে ছড়াতে পারে।
১৯১৬ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত এই রোগে প্রায় ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। তবে হঠাৎ করেই রোগটি উধাও হয়ে যায়। বিজ্ঞানীরা এখনও নিশ্চিত নন, এর প্রকৃত কারণ কী ছিল এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের রোগ আবারও ফিরে আসবে কি না।
সিএ/এমআর


