বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনকে ছেলেখেলায় পরিণত করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী অধ্যাপক আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ১৯৭৫ সালে সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনী মাত্র ১৭ মিনিটে পাস হয়েছিল, যা কোনো কমিটিতে যায়নি। অথচ যেকোনো রকম বিল পাস করতে বিধান অনুযায়ী সেটি একটি কমিটিতে পাঠাতে হয়। আলী রীয়াজ উল্লেখ করেন, শুধু চতুর্থ সংশোধনী নয়, এমন আরও সংশোধনী হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন সংক্রান্ত এই পরিস্থিতি প্রতিরোধে উচ্চকক্ষ গঠনের পক্ষে মত দেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, উচ্চকক্ষ থাকলে সংবিধান সংশোধনে বিস্তৃত ঐকমত্যের প্রয়োজন হবে এবং প্রতিটি ভোটের গুরুত্ব বাড়বে।
আজ সোমবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে আয়োজিত ‘গণভোট–২০২৬ বিষয়ে জনসচেতনতামূলক প্রচার-প্রচারণা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে আলী রীয়াজ এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
তরুণদের ‘হ্যাঁ’ ভোটে উদ্বুদ্ধ করতে আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই জাতীয় সনদ কেবল একটি দলিল নয়, এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের পথরেখা। তিনি উল্লেখ করেন, দেশের ভবিষ্যতের পথ প্রণয়নে তরুণদের রক্তের অবদান রয়েছে এবং ভবিষ্যতে তাদের জন্য জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা নিশ্চিত করতে গণভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
গণভোটকে শুধুমাত্র সরকারের বিষয় নয় বলেও মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তিনি বলেন, ‘গণভোট হচ্ছে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন। নাগরিক হিসেবে আমাদের কি ভূমিকা থাকবে, সেটাই মূল প্রশ্ন। অন্তর্বর্তী সরকার মাত্র ১০–১২ দিনের বেশি দায়িত্বে থাকবে না। কিন্তু দেশের জন্য যারা প্রাণ দিয়েছে, যারা লড়াই করেছে, গুম হয়েছে, খুন হয়েছে, তাদের কৃতজ্ঞতা স্মরণ করে আমাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে।’
বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলার জন্য আলী রীয়াজ বলেন, সরকার নয়, নাগরিকরাই এই দায়িত্ব নিতে হবে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘“হ্যাঁ” ভোট আমাদের সেই সুযোগ দিয়েছে।’
রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের দায়িত্বকে দায় হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তনের সুযোগ গত ৫৪ বছরে আসেনি। অনেক রক্তের বিনিময়ে এসেছে। আমাদের প্রত্যেকের ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব পালন করা জরুরি।’
জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনে আলী রীয়াজ বলেন, বর্তমান সংবিধানে জরুরি অবস্থায় মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার পর্যন্ত নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদে বলা হয়েছে, জীবনধারার অধিকার কখনও স্থগিত করা যাবে না এবং জরুরি অবস্থায় বিরোধী দলের অংশগ্রহণ থাকা বাধ্যতামূলক।
অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের এমন একটি রাষ্ট্র হওয়ার কথা ছিল, যেখানে নাগরিকরা স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন না। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোগত অনিয়মের শিকল ভাঙা না গেলে এই অসুবিধা কাটানো সম্ভব হবে না।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক সালেহ্ হাসান নকীব অনুষ্ঠানে বলেন, ‘গণভোট না থাকলে ব্যক্তিগতভাবে নির্বাচনে আগ্রহ হতো না। আমি ভোট দিতে যাব প্রধানত গণভোটে “হ্যাঁ” ভোট দিতে, কারণ এটি রক্তের ঋণ মেটানোর পথ।’
অনুষ্ঠানে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, শিক্ষক, জুলাই আন্দোলনে শহীদদের পরিবার, আহত ব্যক্তি ও সমন্বয়করা বক্তব্য দেন।
সিএ/এমই


