ইতিবাচক মানসিকতা মানুষের শরীরের প্রাকৃতিক রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে পারে—এমনই তথ্য উঠে এসেছে সাম্প্রতিক এক বৈজ্ঞানিক গবেষণায়। গবেষকদের মতে, সঠিক মানসিক কৌশল প্রয়োগের মাধ্যমে শরীরের সংক্রমণ প্রতিরোধ, টিউমার এবং ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, যারা ইতিবাচক চিন্তার মাধ্যমে মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড সিস্টেম’-এর নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় রাখতে সক্ষম হন, তাদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা তুলনামূলকভাবে বেশি হয়। সাধারণ মানুষের তুলনায় তাদের শরীর বেশি অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে পারে, যা রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাকে জোরদার করে।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কেবল আশাবাদী হলেই সব রোগ সেরে যাবে—এমন ধারণা সঠিক নয়। এই গবেষণা থেকে মূলত এমন ইঙ্গিত মিলেছে যে, ইতিবাচক মানসিক অনুশীলন রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে সহায়ক শক্তি দিতে পারে, যা প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে কাজ করতে পারে।
তেল আবিব ইউনিভার্সিটির মনোরোগবিদ্যা ও নিউরোসায়েন্স বিভাগের অধ্যাপক তালমা হেন্ডলার বলেন, মানুষের ওপর পরিচালিত এই গবেষণাই প্রথম যেখানে সরাসরি কারণ–ফলাফলের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাঁর মতে, মস্তিষ্কের ভালো লাগা বা পুরস্কার ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে পারলে শরীরের ইমিউনাইজেশন কার্যকারিতা বাড়তে পারে।
এর আগে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণায়ও ইতিবাচক প্রত্যাশা রোগীদের দ্রুত সুস্থ হতে সহায়তা করে—এমন ধারণা পাওয়া গিয়েছিল, যা সাধারণভাবে ‘প্লাসেবো ইফেক্ট’ নামে পরিচিত। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় মস্তিষ্কের এই বিশেষ অংশ সক্রিয় হলে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে—এমন প্রমাণ মিললেও মানুষের ক্ষেত্রে বিষয়টি এত দিন পরিষ্কার ছিল না।
এই গবেষণায় অংশ নেওয়া সুস্থ স্বেচ্ছাসেবকদের মানসিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শেখানো হয়, কীভাবে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অংশ সক্রিয় রাখা যায়। চারটি প্রশিক্ষণ সেশনের পর তাদের হেপাটাইটিস-বি টিকা দেওয়া হয়। পরবর্তী দুই ও চার সপ্তাহে রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে শরীরে অ্যান্টিবডির মাত্রা পরিমাপ করা হয়।
ফলাফলে দেখা যায়, যারা মস্তিষ্কের রিওয়ার্ড সিস্টেমের ‘ভেন্ট্রাল টেগমেন্টাল এরিয়া’ বেশি সক্রিয় রাখতে পেরেছেন, তাদের শরীরে টিকার কার্যকারিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে ইতিবাচক প্রত্যাশা ও ভালো কিছুর কল্পনার মাধ্যমে মন চাঙ্গা রাখা অংশগ্রহণকারীরা এ ক্ষেত্রে বেশি সফল হয়েছেন।
গবেষণার সহ-লেখক ড. তামার কোরেন জানান, তাদের দল এখন পরীক্ষা করে দেখছে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অন্যান্য অংশেও এই মানসিক কৌশলের প্রভাব পড়ে কি না। গবেষণার প্রধান লেখক ড. নিৎজান লুবিয়ানিকার বলেন, এই পদ্ধতি কখনোই মূল টিকা বা প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প নয়; বরং সহায়ক উপায় হিসেবে ব্যবহারের সম্ভাবনা রয়েছে।
ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটি সেন্ট লুইসের প্যাথলজি ও ইমিউনোলজি বিভাগের অধ্যাপক জোনাথন কিপনিসও মনে করেন, বড় পরিসরের ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের মাধ্যমে এর কার্যকারিতা প্রমাণিত হলে ভবিষ্যতে এটি প্রচলিত চিকিৎসা ব্যবস্থার সহায়ক অংশ হতে পারে।
গবেষণাটি বিজ্ঞানভিত্তিক জার্নাল নেচার মেডিসিন-এ প্রকাশ পেয়েছে।
সিএ/এমআর


