মানব ইতিহাসে মদ বা অ্যালকোহল শুধু আনন্দ ও উৎসবের প্রতীকই নয়, বরং সমাজ ও সভ্যতার গঠনেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তবে আজকের দিনে এটি স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক পরিবর্তনের কারণে মানুষের সঙ্গে এর সম্পর্কের চিরকালীন ‘প্রেম’ যেন ফাটল ধরছে।
গবেষকরা দেখেছেন, অ্যালকোহল মস্তিষ্কের নিউরোট্রান্সমিটার ‘সেরোটোনিন’ ও ‘ডোপামিন’-এর মাত্রা বাড়িয়ে মানুষের মিশুক স্বভাবকে আরও জোরালো করে। কিন্তু আধুনিক সময়ের পরিবর্তিত রুচি, স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং সামাজিক সচেতনতার কারণে অনেক উন্নত দেশে মদ্যপানের হার কমছে।
মানব পূর্বপুরুষরা প্রাকৃতিকভাবে তৈরি পচা ফলের মাধ্যমে অ্যালকোহলের সঙ্গে পরিচিত হয়। প্রায় এক কোটি বছর আগে মানুষের শরীরে এমন জিনগত পরিবর্তন হয়, যা অ্যালকোহল দ্রুত হজম করতে সাহায্য করত। এ কারণে মানুষের পূর্বপুরুষরা ‘মাতাল বানর’ হিসেবে পরিচিত ছিল, যা তাদের খাদ্যাভ্যাস ও টিকে থাকার কৌশলে সাহায্য করত।
১০ হাজার বছর আগে মানুষ নিজেই মদ তৈরি করতে শিখেছিল। চীনের ‘জিয়াহু’ স্থানে খুঁজে পাওয়া প্রাচীন মদ প্রমাণ করে, মানুষ সম্ভবত এরও অনেক আগে মদ তৈরি করত। মদ সামাজিক বন্ধন, উৎসব ও রাজনৈতিক কাঠামো গঠনে সাহায্য করত। ড. রবিন ডানবার এবং অন্যান্য গবেষকরা দেখিয়েছেন, মদ্যপান আদিম সমাজে পারস্পরিক সম্পর্ক, সহযোগিতা এবং আনন্দ উদযাপনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তবে আধুনিক গবেষণা বলছে, অ্যালকোহল স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। ২০২৩ সালে WHO ঘোষণা করেছে, অ্যালকোহলের কোনো মাত্রাই সম্পূর্ণ নিরাপদ নয়। অতিরিক্ত মদ্যপান প্রতি বছর প্রায় ১৮ লাখ মানুষকে হত্যা করে এবং শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এ অবস্থায় মদ শিল্প নতুন দিক খুঁজছে। অ্যালকোহলবিহীন বা অল্প অ্যালকোহলযুক্ত পানীয়, ‘ফাংশনাল ড্রিঙ্কস’ এবং ভেষজ উপাদান মিশ্রিত পানীয় জনপ্রিয় হচ্ছে। এগুলো মানুষের আনন্দ, সামাজিক মেলামেশা এবং মানসিক প্রশান্তি বজায় রাখতে সহায়ক।
অতীতে কোটি বছরের অভ্যাস রাতারাতি শেষ হবে না। তবে মানুষের সামাজিক ও স্বাস্থ্য সচেতনতার কারণে ভবিষ্যতে মদ্যপানের চিত্র বদলে যেতে পারে। অ্যালকোহলবিহীন পানীয় ও অন্যান্য বিকল্প মাধ্যম মানুষকে একই আনন্দ, সামাজিক বন্ধন ও উৎসব উদযাপনের সুযোগ দেবে।
সিএ/এমআর


