শিশুর দুষ্টুমি নিয়ে অনেক অভিভাবকই হতাশ হয়ে পড়েন। প্রায়ই শোনা যায়—‘আমার সন্তান খুব দুষ্টু, ওকে না মারা পর্যন্ত কথা শোনে না।’ কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সন্তানের গায়ে হাত তোলা কোনোভাবেই কার্যকর বা যুক্তিসংগত সমাধান নয়। শিশুরা স্বভাবতই চঞ্চল হয়, আবেগ প্রকাশের ভাষা শেখার আগেই তারা জেদ, কান্না বা দুষ্টুমির মাধ্যমে নিজের অনুভূতি জানাতে চায়।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শিশুর এই আচরণ জন্মগত নয়। শারীরিক বিকাশের পাশাপাশি মানসিক বিকাশও ধাপে ধাপে ঘটে। হামাগুড়ি দেওয়া বয়সে যেমন সে বুঝতে পারে না কোনটি খাওয়ার উপযোগী, তেমনি সে জানে না কীভাবে চাওয়া-পাওয়া বা মন খারাপের অনুভূতি প্রকাশ করতে হয়। এসবই তাকে ধীরে ধীরে শেখাতে হয়, ভালোবাসা ও ধৈর্যের মাধ্যমে।
অভিভাবকের আচরণই শিশুর ব্যক্তিত্ব গঠনে বড় ভূমিকা রাখে। যখন শিশুর দুষ্টুমি বা অস্বাভাবিক আচরণের জবাবে মারধর করা হয়, তখন তা সাময়িকভাবে তাকে শান্ত করলেও দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। শাসনের নামে শারীরিক আঘাত সন্তান ও অভিভাবক উভয়ের মানসিক স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকর বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
এই বিষয়টি বোঝাতে মনোবিজ্ঞানীরা ধূমপানের উদাহরণ টানেন। কেউ কখনো ধূমপান না করলে আসক্ত হওয়ার ঝুঁকি কম থাকে। কিন্তু একবার শুরু করলে তা অভ্যাসে পরিণত হতে পারে। একইভাবে, একবার সন্তানের গায়ে হাত তোলা হলে তা ধীরে ধীরে অভ্যাসে রূপ নিতে পারে। এতে শিশুর মনে ভয় তৈরি হয় এবং সে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে।
মনোবিজ্ঞানে কার্যকর প্যারেন্টিং পদ্ধতির একটি হলো জেন্টল প্যারেন্টিং। এই পদ্ধতিতে শিশুর আচরণের চেয়ে অভিভাবকের নিজের আচরণ নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। শিশুর আবেগকে সম্মান করা, কারণ বোঝা এবং শারীরিক বা মানসিক আঘাত ছাড়াই শাসন করার চর্চাই এর মূল কথা।
প্যারেন্টিংয়ের ধরনগুলো বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা বলেন, অথোরিটেটিভ বা জেন্টল প্যারেন্টিং শিশুর মানসিক বিকাশে সবচেয়ে কার্যকর। এই পদ্ধতিতে শিশুর আবেগকে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তিসংগত সীমারেখা তৈরি করা হয়। এতে শিশু বুঝতে শেখে, কোনটি গ্রহণযোগ্য আর কোনটি নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জেনিয়ার ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ড. ব্রায়ান রাজ্জিনো এক প্রতিবেদনে বলেন, ‘জেন্টল প্যারেন্টিং মানে শুধু আদরে বড় করা নয়, বরং এটি সন্তানকে প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা শেখানোর কৌশল।’ তার মতে, এই পদ্ধতি শিশুকে আত্মবিশ্বাসী ও সহানুভূতিশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে।
বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন নিয়ম বা কাঠামো, ভালোবাসা ও উষ্ণতা, শিশুকে আলাদা ব্যক্তি হিসেবে সম্মান করা এবং দীর্ঘমেয়াদে ধৈর্য ধরে তাকে গড়ে তোলার মানসিকতা। সন্তান নিখুঁত অভিভাবক চায় না; সে চায় এমন মা-বাবা, যারা চেষ্টা করেন, ভুল হলে ক্ষমা চান এবং ভালোবাসা দিয়ে নেতৃত্ব দেন।
সিএ/এমআর


