প্রযুক্তি জগতে বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই। সাম্প্রতিক সময়ে পদার্থবিদ্যায় নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন কৃত্রিম নিউরন কাঠামো নিয়ে গবেষণা করা দুই শীর্ষ বিজ্ঞানী, যা মানুষের স্মৃতির মতো কাজ করতে সক্ষম এক নতুন প্রযুক্তির সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই অগ্রগতি এআইকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে মানুষের সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
এআইয়ের ক্রমবর্ধমান ক্ষমতা, সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিয়ে উদ্বিগ্ন শুধু বিজ্ঞানী বা গবেষকরাই নন, ব্যবসায়ী ও দার্শনিকরাও। দীর্ঘদিন এআই গবেষণার অগ্রদূত নোবেলজয়ী জেফ্রি হিন্টন একসময় বিশ্বাস করতেন, মানুষের মস্তিষ্ক এআইয়ের তুলনায় অনেক বেশি উন্নত। তবে ২০২৩ সালে তিনি ভিন্ন উপলব্ধিতে পৌঁছান। এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, বর্তমানে এআই এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই মানুষের মস্তিষ্কের চেয়ে এগিয়ে এবং কেবল আরও বিস্তৃত প্রয়োগই বাকি। তিনি সতর্ক করে বলেন, এখনই যদি এআইয়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তবে মানবজাতি অস্তিত্ব সংকটে পড়তে পারে।
মানুষের মস্তিষ্কে প্রায় ১০০ বিলিয়ন নিউরন এবং প্রায় ১০০ ট্রিলিয়ন আন্তঃসংযোগ রয়েছে। গবেষকদের ধারণা, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যেই এআই সিস্টেম একই পরিমাণ কানেকশন তৈরি করতে সক্ষম হতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আরও বড় ও শক্তিশালী এআই সিস্টেম তৈরিতে প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
নিউরাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বিপুল তথ্য বিশ্লেষণে হিন্টনের গবেষণা এআইকে বড় ধরনের সক্ষমতা দিয়েছে। ফলে এআই এখন ছবি শনাক্ত করা, ভাষা বোঝা এমনকি স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি চালানোর মতো কাজও করতে পারছে। এই দ্রুত অগ্রগতির কারণেই তিনি নিজেই এআইয়ের সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং গুগলের ভাইস প্রেসিডেন্টের পদ ছেড়ে দেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এআইয়ের অগ্রযাত্রা থামানো সম্ভব নয়। তাই ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেওয়াই সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ। অনেক দেশ ইতিমধ্যে শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করছে এবং প্রযুক্তির ইতিবাচক ব্যবহার সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।
অনেক বিশ্লেষকের মতে, উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতায় এআই মানুষের তুলনায় এগিয়ে যেতে পারে। এআইকে বেতন দিতে হয় না, ছুটি লাগে না এবং নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করা সম্ভব। এর ফলে লেখালেখি, সাংবাদিকতা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিক্ষা, বিনোদন এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসছে। কিছু পেশায় কর্মসংস্থান কমলেও, নতুন খাতে কাজের সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
তবে মানুষের আবেগ, অনুভূতি ও জটিল চিন্তাশক্তি যন্ত্রের পক্ষে পুরোপুরি অনুকরণ করা সম্ভব নয় বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। তাই রোবট বা যন্ত্র যতই উন্নত হোক, মানুষের সঙ্গে মৌলিক পার্থক্য থেকেই যাবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ এবং মানবকল্যাণে এআইকে কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
সিএ/এমআর


