এক সময় যুদ্ধ মানেই ছিল সৈন্যের মুখোমুখি সংঘর্ষ। জয়-পরাজয় নির্ভর করত সেনাসংখ্যা, শারীরিক সক্ষমতা ও সাহসের ওপর। সময়ের সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ আর শুধু রণাঙ্গনে সীমাবদ্ধ নেই; এর বিস্তার ঘটেছে মহাকাশ, সাইবার জগৎ ও তথ্যপ্রযুক্তির পরিসরে। বন্দুক ও কামানের পাশাপাশি ড্রোন, স্যাটেলাইট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটাল প্রযুক্তি হয়ে উঠেছে যুদ্ধের প্রধান অস্ত্র।
প্রযুক্তির এই অগ্রগতি যুদ্ধকে যেমন আরও কার্যকর করেছে, তেমনি তা ভয়ংকর রূপও নিয়েছে। ইউক্রেন থেকে গাজা, রাশিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্র—সর্বত্রই যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে প্রযুক্তির হাতে। এতে মানবিকতা, নৈতিকতা ও যুদ্ধের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। আদৌ কি ভবিষ্যতের যুদ্ধ মানুষের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, নাকি যন্ত্রই নেবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—এই প্রশ্ন এখন ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর যুদ্ধের অন্যতম বাস্তব উদাহরণ। সামরিক শক্তিতে তুলনামূলকভাবে দুর্বল হলেও ইউক্রেন প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। এই যুদ্ধে ড্রোনের ব্যাপক ব্যবহার দেখা গেছে। কম খরচের ছোট ড্রোন দিয়ে শত্রুপক্ষের সেনা অবস্থান, ট্যাংক ও অস্ত্রভান্ডার শনাক্ত করে নিখুঁত হামলা চালানো হয়েছে। স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া তথ্যের মাধ্যমে আগাম শত্রুর গতিবিধি জানা সম্ভব হয়েছে। পাশাপাশি উভয় পক্ষই একে অপরের যোগাযোগ ও তথ্যব্যবস্থায় সাইবার হামলা চালিয়েছে।
আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন এখন সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রগুলোর একটি। চালকবিহীন এই উড়োজাহাজ নজরদারি, তথ্য সংগ্রহ ও নির্ভুল হামলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন ক্যামেরা ও সেন্সরের মাধ্যমে ড্রোন শত্রুপক্ষের অবস্থান ও সেনা চলাচলের তথ্য সরবরাহ করে। এতে সৈন্যদের সরাসরি ঝুঁকিতে না ফেলে দূর থেকেই আঘাত হানা সম্ভব হচ্ছে। তবে প্রযুক্তিগত ত্রুটি বা ভুল তথ্যের কারণে বেসামরিক মানুষের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকিও থেকেই যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আধুনিক যুদ্ধে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও দ্রুত করেছে। বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই খুব অল্প সময়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সহায়তা দিতে পারে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ইসরায়েলের মতো দেশগুলো স্বয়ংক্রিয় লক্ষ্য নির্ধারণ ও যুদ্ধ পরিকল্পনায় এআই ব্যবহার করছে। এতে যুদ্ধের গতি বাড়লেও দায়বদ্ধতা ও নৈতিকতার প্রশ্ন আরও জটিল হয়ে উঠছে।
স্যাটেলাইট ও জিপিএস প্রযুক্তিও আধুনিক যুদ্ধের অপরিহার্য অংশ। স্যাটেলাইটের মাধ্যমে শত্রুপক্ষের অবস্থান ও সামরিক ঘাঁটির ওপর সার্বক্ষণিক নজর রাখা সম্ভব হচ্ছে। জিপিএস প্রযুক্তির সহায়তায় ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে পারছে। ফলে যুদ্ধ আরও প্রযুক্তিনির্ভর ও নিয়ন্ত্রিত রূপ নিচ্ছে।
এর পাশাপাশি রোবট ও স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহারও বাড়ছে। বোমা নিষ্ক্রিয়করণ, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় তল্লাশি কিংবা পাহারার কাজে রোবট ব্যবহারের ফলে সৈন্যদের প্রাণঝুঁকি কমছে। তবে মানুষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই যদি অস্ত্র আঘাত হানে, তাহলে মানবিক মূল্যবোধ কোথায় দাঁড়াবে—সে প্রশ্নও জোরালো হচ্ছে।
প্রযুক্তিনির্ভর এই পরিবর্তন যুদ্ধক্ষেত্রে যেমন সুফল এনেছে, তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকি। আধুনিক প্রযুক্তি যুদ্ধকে সহজ ও দ্রুত করে তুলছে, যা ভবিষ্যতে সংঘাত বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি করছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়—যুদ্ধের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি যন্ত্র নেবে, নাকি মানবিক বিবেচনার জায়গা বজায় থাকবে?
সিএ/এসএ


