ভারতের উত্তর প্রদেশের নয়ডায় প্রায় ৭০ ফুট গভীর একটি জলাবদ্ধ গর্তে পড়ে এক যুবকের মৃত্যু হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সাহায্যের জন্য চিৎকার শোনা গেলেও উদ্ধারকর্মীরা পানিতে নামতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁদের যুক্তি ছিল, পানি অত্যন্ত ঠান্ডা এবং ভেতরে বিপজ্জনক ধাতব বস্তু থাকতে পারে। শেষ পর্যন্ত উদ্ধার বিলম্বিত হওয়ায় ওই যুবকের প্রাণ যায়।
নিহত যুবকের নাম যুবরাজ মেহতা। বয়স ২৭ বছর। তিনি পেশায় একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন। গত শুক্রবার মধ্যরাতে নয়ডার সেক্টর ১৫০ এলাকায় গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফেরার সময় এ দুর্ঘটনা ঘটে।
পুলিশ ও স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘন কুয়াশার কারণে যুবরাজের গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি নিচু সীমানাপ্রাচীরে ধাক্কা খায় এবং পাশে থাকা জলাবদ্ধ গভীর গর্তে পড়ে যায়। গর্তটি কয়েক বছর আগে একটি নির্মাণ প্রকল্পের জন্য খনন করা হয়েছিল, যা পরে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, গাড়িটি পানিতে পড়ার পর ধীরে ধীরে ডুবতে শুরু করে। যুবরাজ কোনোভাবে গাড়ি থেকে বের হয়ে ছাদের ওপর উঠে দাঁড়াতে সক্ষম হন। সেখান থেকেই তিনি তাঁর বাবা রাজকুমার মেহতাকে ফোন করে সাহায্যের আবেদন জানান।
রাজকুমার মেহতা গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমার ছেলে ফোন করে বলেছিল, “পাপা, গাড়িটা একটা নালায় পড়ে গেছে। আমি আটকা পড়েছি।” আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সময় সে তখনো জীবিত ছিল, কিন্তু কেউ তার কাছে পৌঁছাতে পারছিল না।’
রাত ১টার পর মনিন্দর নামে এক পথচারী নিজের কোমরে দড়ি বেঁধে যুবরাজকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। তবে অন্ধকার ও গভীরতার কারণে তিনি গাড়ি বা যুবরাজের অবস্থান শনাক্ত করতে পারেননি।
মনিন্দরের অভিযোগ, এর মধ্যেই পুলিশ ও জরুরি উদ্ধারকর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও তাঁরা পানিতে নামেননি। তাঁর বরাতে জানা যায়, উদ্ধারকর্মীরা বলেন, ‘পানি অনেক ঠান্ডা। ভেতরে লোহার রড আছে। আমরা নামব না।’
প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে যুবরাজকে সাহায্যের জন্য চিৎকার করতে শোনা গেলেও পরে তাঁর কণ্ঠস্বর আর শোনা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিটের দিকে তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর, ভোর হওয়ার পর বিশেষ প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল এসে মরদেহ উদ্ধার করে।
পুলিশ জানায়, মধ্যরাতের পরপরই রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনী ও জাতীয় দুর্যোগ মোকাবিলা বাহিনীকে খবর দেওয়া হয়েছিল। তবে ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে সময় নেয়।
গ্রেটার নয়ডার সহকারী পুলিশ কমিশনার হেমন্ত উপাধ্যায় বলেন, প্রশিক্ষণহীন কেউ গর্তে নামলে আরও প্রাণহানির ঝুঁকি ছিল। তাঁর ভাষায়, ‘পানির গভীরতা ছিল অনেক বেশি, দৃশ্যমানতা ছিল খুব কম এবং পানির নিচে ধ্বংসাবশেষ থাকার আশঙ্কা ছিল।’
এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁরা উদ্ধারকাজে দেরি এবং কর্তৃপক্ষের অবহেলার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভ করেন। নিহতের পরিবারের দাবি, গর্তটি দীর্ঘদিন ধরেই অরক্ষিত ছিল এবং রাস্তায় কোনো প্রতিফলক বা সতর্কতামূলক চিহ্ন ছিল না।
রাজকুমার মেহতা বলেন, ‘জায়গাটি উন্মুক্ত ছিল। ঘন কুয়াশা থাকা সত্ত্বেও কোনো রিফ্লেক্টর ছিল না। এই ঘটনা এড়ানো যেত।’
পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে পুলিশ দুজন স্থানীয় রিয়েল এস্টেট ডেভেলপারের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করেছে। এ ছাড়া দুর্ঘটনার পরপরই গর্তটি আবর্জনা ও ধ্বংসাবশেষ দিয়ে ভরাট করে দেওয়ায় প্রমাণ নষ্টের অভিযোগ উঠেছে।
ঘটনাটি নিয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াও দেখা দিয়েছে। শহর কর্তৃপক্ষের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। পুরো ঘটনার দায় নির্ধারণ ও উদ্ধারকাজে গাফিলতি হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে উত্তর প্রদেশ সরকার বিশেষ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
সূত্র: দ্য ইনডিপেনডেন্ট, হিন্দুস্তান টাইমস
সিএ/এসএ


