বাংলাদেশে দীর্ঘ ২০ বছরের এক গবেষণায় দেখা গেছে, পানীয় জলে আর্সেনিকের মাত্রা কমিয়ে আনা হলে হৃদ্রোগ, ক্যানসার এবং অন্যান্য দীর্ঘস্থায়ী রোগে মৃত্যুর হার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটি, কলাম্বিয়া মেলম্যান স্কুল অব পাবলিক হেলথ এবং নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীরা এই গবেষণার নেতৃত্ব দিয়েছেন। গবেষণাটি চিকিৎসাবিষয়ক জার্নাল ‘জামাত’-এ প্রকাশিত হয়েছে এবং বিজ্ঞানীরা এটিকে আর্সেনিকের ক্ষতিকর প্রভাব ও নিরাপদ পানি ব্যবহারের সুফলের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘকাল দূষিত পানি পান করার পরও যদি কেউ নিরাপদ পানির উৎসে ফিরে আসে, তবে তার মৃত্যুঝুঁকি নাটকীয়ভাবে হ্রাস পায়। ২০০০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলায় প্রায় ১১ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে অন্তর্ভুক্ত করে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। অংশগ্রহণকারীদের মূত্র পরীক্ষা করে শরীরে আর্সেনিকের উপস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হয়। যাদের শরীর থেকে আর্সেনিকের মাত্রা কমে নিরাপদ পর্যায়ে এসেছে, তাদের মৃত্যুর হার নিরাপদ পানি পান করা ব্যক্তিদের সমান হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, আর্সেনিকমুক্ত পানি ব্যবহার হৃদ্রোগ ও ক্যানসারে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় অর্ধেক কমিয়ে দিতে সক্ষম। তবে যারা এখনও উচ্চ মাত্রার আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছেন, তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি।
নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটির গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের বিজ্ঞানী ফেন উ বলেছেন, গবেষণাটি আর্সেনিকমুক্ত পানি এবং মৃত্যুঝুঁকি হ্রাসের মধ্যে সবচেয়ে স্বচ্ছ প্রমাণ। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ভূগর্ভস্থ পানিতে প্রাকৃতিকভাবে থাকা আর্সেনিক বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, বাংলাদেশে প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ ১০ মাইক্রোগ্রাম/লিটারের বেশি আর্সেনিকযুক্ত পানি পান করছে। এটি ইতিহাসের বৃহত্তম গণ-বিষক্রিয়া হিসেবে পরিচিত। কলম্বিয়া ক্লাইমেট স্কুলের বিজ্ঞানী লেক্স ভ্যান গিন বলেন, দীর্ঘমেয়াদি আর্সেনিক সংস্পর্শে থাকা মানুষ যখন নিরাপদ পানি পান শুরু করেন, তখন শুধুমাত্র ভবিষ্যতের নয়, অতীতের ক্ষতির প্রভাব থেকেও জীবন রক্ষা হয়। তিনি তুলনা করেছেন, ধূমপান ছাড়ার মতোই আর্সেনিকমুক্ত পানি পান শরীরের অভ্যন্তরীণ ক্ষতিগুলো কাটিয়ে ওঠার সুযোগ দেয়।
গবেষক দল বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে আর্সেনিক সংক্রান্ত তথ্য সহজলভ্য করার উদ্যোগ নিয়েছে। তারা ‘নলকূপ’ নামে একটি বিনা মূল্যের মোবাইল অ্যাপ তৈরি করেছে, যা ৬০ লাখের বেশি টিউবওয়েলের পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। এটি সরকারি কর্মকর্তাদেরকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নতুন বা গভীর নলকূপ স্থাপনের জন্য সাহায্য করবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক কাজী মতিন আহমেদ বলেন, এই ফলাফল বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের নীতিনির্ধারকদের আর্সেনিক “হট স্পট” বা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে উদ্বুদ্ধ করবে।
সিএ/এমআর


