শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) প্রকাশিত এক বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, শিক্ষার্থীদের জীবনে বইয়ের গুরুত্ব ক্রমেই কমে যাচ্ছে, আর তার জায়গা দখল করছে রিল, শর্ট ভিডিও ও অবিরাম স্ক্রলিংয়ের অভ্যাস। যেখানে বইয়ের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক থেকেই জন্ম নেয় নতুন চিন্তা, গড়ে ওঠে সৃজনশীলতা ও গভীর মনোযোগ, সেখানে এখন শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ সময় কাটাচ্ছে দ্রুতগতির বিনোদনমূলক কনটেন্টে।
একসময় যে শিক্ষার্থী নিজে ভাবত, নিজে শিখত এবং নিজেই নতুন কিছু তৈরি করত, এখন সে অধিকাংশ সময় সামাজিক মাধ্যমে কেবল দেখে, প্রতিক্রিয়া দেয় এবং স্কিপ করে সামনে এগিয়ে যায়। এতে চিন্তার জায়গায় সৃষ্টি কমে গিয়ে বাড়ছে শুধু গ্রহণের প্রবণতা। এর ফলে ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে উৎপাদনশীলতা এবং শেখার গভীরতা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শর্ট কনটেন্ট মস্তিষ্কে তাৎক্ষণিক আনন্দ দেয় এবং দ্রুত ডোপামিন নিঃসরণ ঘটায়, যা ধীরে ধীরে আসক্তিতে পরিণত হয়। এই অভ্যাস গভীর চিন্তার প্রতি অনীহা তৈরি করে। একজন শিক্ষার্থী যখন নতুন কিছু ভাবতে বসে, তখন সে দ্রুত বিরক্ত হয়ে পড়ে। এতে স্পষ্ট হয়, প্রতিদিনের অভ্যাসই ধীরে ধীরে তার মানসিক গঠন নির্ধারণ করছে।
মনোযোগ ভাঙনের বিষয়টিও উদ্বেগজনক আকার ধারণ করেছে। একসময় যে শিক্ষার্থী এক ঘণ্টার শিক্ষণীয় কনটেন্ট ধৈর্য ধরে অনুসরণ করতে পারত, এখন সে ৩০ সেকেন্ডের ভিডিও দেখেই অস্থির হয়ে ওঠে। পাঁচ মিনিটের একটি লেখা পড়ার মতো ধৈর্য অনেকেরই নেই। ফলে চিন্তার কাঠামো এমনভাবে তৈরি হচ্ছে, যেখানে যে কোনো বিষয় দ্রুত স্কিপ করাই স্বাভাবিক অভ্যাসে পরিণত হচ্ছে। তখন নতুন আইডিয়া কেন তৈরি হচ্ছে না, সেই প্রশ্নও সামনে আসে।
বাস্তবতা হলো, আইডিয়ার জন্ম হয় নিরবতা, একঘেয়েমি এবং গভীর মনোযোগ থেকে। কিন্তু অবিরাম স্ক্রলিং এই তিনটি উপাদানকেই ধ্বংস করছে। ব্যক্তি অন্য অর্থবহ কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিচ্ছে এবং নিজের জন্য প্রয়োজনীয় চিন্তার জায়গা তৈরি করতে পারছে না। অন্যের তৈরি কনটেন্টই তার চিন্তাজগৎ দখল করে রাখছে, যা সৃজনশীলতার ধীরে ধীরে ক্ষয় ঘটাচ্ছে।
ডোপামিন নির্ভর এই আচরণগত পরিবর্তনের আরেকটি প্রভাব হলো কঠিন কাজ এড়িয়ে চলার প্রবণতা। শর্টকাট আনন্দে অভ্যস্ত মন স্বাভাবিকভাবেই পরিশ্রমসাধ্য চিন্তা বা কাজ থেকে দূরে থাকে। আর যে ব্যক্তি নিয়মিত কঠিন কাজ এড়িয়ে চলে, তার জীবনে বড় সাফল্যের সম্ভাবনাও কমে যায়। এই পরিবর্তন হঠাৎ নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ফল।
আরও একটি বাস্তব চিত্র হলো, শিক্ষার্থীর ইচ্ছে থাকে পড়ার, কিন্তু পড়া শুরু করতেই ফোন ধরার তাড়না কাজ করে। যে সময়টুকু পড়াশোনায় দেওয়ার কথা, তার চেয়ে অনেক বেশি সময় চলে যায় ফোনে। ফলে শেখা সীমাবদ্ধ থাকে উপরের স্তরে, গভীর বোঝাপড়া তৈরি হয় না। আত্মনিয়ন্ত্রণ ক্ষমতাও ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়ে।
এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নিজেদের জীবন ও ভবিষ্যৎ উন্নয়ন নিয়ে ভাবার সময়ও কম পায়। তারা বেশি ব্যস্ত থাকে অন্যের জীবন দেখায়। আত্মসমালোচনা ও আত্মউন্নয়নের জায়গাটি অনুপস্থিত হয়ে পড়ে, ফলে আত্ম-উপলব্ধির দরজাও ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে যায়।
এই প্রেক্ষাপটে নিজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রাখা জরুরি, আমি কি কনটেন্ট ব্যবহার করছি, নাকি কনটেন্ট আমাকে ব্যবহার করছে। সমাধানের পথ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্ক্রলিংয়ের সময় কমাতে হবে, নিরব সময় তৈরি করতে হবে এবং গভীর কাজে নিজেকে যুক্ত করতে হবে। এখানে কেবল উপদেশ নয়, ব্যক্তিগত উপলব্ধিই হতে পারে পরিবর্তনের সবচেয়ে কার্যকর অনুঘটক।
প্রতিটি স্ক্রল এবং প্রতিটি স্কিপ ধীরে ধীরে একজন শিক্ষার্থীকে অগভীর করে তোলে। আর চিন্তার গভীরতা বাড়াতে হলে আত্মশক্তি, আত্মনিয়ন্ত্রণ ও সচেতনতার বিকল্প নেই।
সিএ/এমআর


