ইতিহাসে মক্কায় মানব বসতি স্থাপনের পেছনে রয়েছে এক গভীর ঐশ্বরিক পরিকল্পনা। ফল-ফসলহীন, জনমানবশূন্য এক পাহাড়ি উপত্যকায় হাজেরা ও তাঁর শিশুপুত্র ইসমাইলের মাধ্যমে যে মানবজীবনের সূচনা হয়, তা কেবল একটি পারিবারিক ঘটনা নয়, বরং কাবাঘর নির্মাণ ও ভবিষ্যতে আসমানি কিতাব নাজিলের প্রস্তুতির সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত।
পবিত্র কোরআনে ইব্রাহিম (আ.)-এর দোয়ার মাধ্যমে বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে, হে আমাদের রব! আমি আমার বংশধরদের কিছু সংখ্যককে বসবাস করালাম অনুর্বর উপত্যকায় আপনার পবিত্র ঘরের কাছে, হে আমাদের রব! এ জন্য যে তারা যেন সালাত কায়েম করে। অতএব আপনি কিছু লোকের অন্তর তাদের প্রতি অনুরাগী করে দিন এবং ফলফলাদি দিয়ে তাদের আহারের ব্যবস্থা করুন। সুরা ইব্রাহিম, আয়াত: ৩৭।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় জানা যায়, আল্লাহর আদেশে ইব্রাহিম (আ.) হাজেরা ও ইসমাইলকে কাবাঘরের নিকট রেখে যান, যেখানে তখন না ছিল মানুষ, না ছিল পানির ব্যবস্থা। হাজেরা প্রথমে উদ্বিগ্ন হলেও যখন জানতে পারেন এটি আল্লাহর নির্দেশ, তখন তিনি বলেন, তাহলে আল্লাহ আমাদের ধ্বংস করবেন না।
পানি ফুরিয়ে গেলে হাজেরা সাফা ও মারওয়া পাহাড়ের মাঝে সাতবার দৌড়ান সাহায্যের আশায়। এরপর আল্লাহর রহমতে জমজম কূপের পানি প্রবাহিত হয়। ফেরেশতা তাঁকে আশ্বস্ত করেন যে এখানে আল্লাহর ঘর নির্মিত হবে এবং এই শিশু তার পিতার সঙ্গে মিলেই তা পুনর্নির্মাণ করবে।
পরবর্তীতে জুরহুম গোত্রের কিছু লোক পাখির ওড়াউড়ি দেখে সেখানে পানির অস্তিত্ব টের পায় এবং হাজেরার অনুমতিতে সেখানে বসতি স্থাপন করে। এভাবেই মক্কায় মানব সমাজের সূচনা হয়। ইসমাইল বড় হয়ে জুরহুম গোত্রের কাছ থেকে আরবি ভাষা শেখেন এবং তাদেরই এক কন্যাকে বিয়ে করেন।
পরে ইব্রাহিম (আ.) পুনরায় এসে ইসমাইলের সঙ্গে কাবাঘরের দেয়াল নির্মাণে অংশ নেন। তাঁরা উভয়ে দোয়া করতে থাকেন, হে আমাদের রব, আমাদের থেকে কবুল করুন। নিশ্চয়ই আপনি সবকিছু শোনেন ও জানেন। সুরা বাকারা, আয়াত: ১২৭।

এই ঘটনার মাধ্যমে দুটি বড় উদ্দেশ্য পূরণ হয়। প্রথমত, কাবাঘরের নির্মাণ ও পুনর্গঠন। দ্বিতীয়ত, বিশুদ্ধ আরবি ভাষার সংরক্ষণ ও বিকাশ। ইসমাইল (আ.)-এর মাধ্যমে যে আরবি ভাষা বিকশিত হয়, তা ভবিষ্যতে কোরআনের ভাষা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়।
ইতিহাসবিদদের মতে, আদম (আ.) ও নূহ (আ.)-এর বংশধররা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ার ফলে নানা ভাষা ও সংস্কৃতির জন্ম হয়। সময়ের সঙ্গে ভাষায় পরিবর্তন আসে। তবে আরবি ভাষাকে বিশেষ উদ্দেশ্যে বারবার বিশুদ্ধ রূপে সংরক্ষণ করা হয়, যাতে তা সর্বশেষ আসমানি কিতাব কোরআনের বাহক হতে পারে।
কোরআনেও বলা হয়েছে, আর আমি অবশ্যই জানি তারা বলে, তাকে তো কেবল একজন মানুষ শিক্ষা দেয়। তারা যার প্রতি এটাকে সম্পর্কযুক্ত করার জন্য ঝুঁকছে, তার ভাষা তো আরবি নয়; অথচ এটা হচ্ছে সুস্পষ্ট আরবি ভাষা। সুরা নাহল, আয়াত: ১০৩।
হাদিসে এসেছে, ইসমাইলের ভাষা কালের আবর্তে বিলীন হয়ে গেলে জিবরাইল (আ.) নবীজি (সা.)-কে সেই বিশুদ্ধ ভাষা শিক্ষা দেন। নবীজি (সা.) বলেন, ইসমাইলের প্রতি এই আরবি ভাষা আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত হয়েছে। বাইহাকি।
এভাবে মক্কার অনুর্বর উপত্যকায় হাজেরা ও ইসমাইলের মাধ্যমে মানব বসতির সূচনা শুধু একটি জনপদের জন্মই নয়, বরং কাবাঘর, বিশুদ্ধ আরবি ভাষা এবং ভবিষ্যতে কোরআন নাজিলের জন্য এক দীর্ঘ ঐশ্বরিক প্রস্তুতির অংশ।
সূত্র: অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ তাজাম্মুল হক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
সিএ/এমআর


