Sunday, June 14, 2026
27.2 C
Dhaka

অন্ধকারে আলোর দিশারি মুজাদ্দিদে আলফে সানি

সত্য যখন ম্লান হয়ে যায়, ন্যায় যখন পরাভূত হয়, তখন আকাশ নীরব থাকে না। মহান আল্লাহ তায়ালা সে সময় মানবজাতির জন্য প্রেরণ করেন মুজাদ্দিদ বা সংস্কারক, যিনি নবী করিম (সা.)–এর রেখে যাওয়া দ্বীনকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রতি শতাব্দীর শুরুতে এমন একজনকে প্রেরণ করবেন, যিনি এই উম্মতের দ্বীনকে সংস্কার করবেন। (আবু দাউদ: ৪২৯১)

এই নবুয়তি ঘোষণারই বাস্তব প্রতিফলন ছিলেন ইমাম রাব্বানী মুজাদ্দিদে আলফে সানি শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.)। ইতিহাসের এক অন্ধকার অধ্যায়ে তিনি তাওহিদের প্রদীপ জ্বালিয়ে সমাজকে পথ দেখিয়েছিলেন। ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগে যখন মুঘল সম্রাট আকবর ভারতবর্ষে দ্বীনে ইলাহি নামের এক বিকৃত মতবাদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ইসলামের মৌলিক ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছিলেন, তখন শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) নির্ভীক কণ্ঠে তাওহিদের পক্ষে অবস্থান নেন।

মুঘল সম্রাট আকবর (১৫৫৬–১৬০৫ খ্রি.) একদিকে শক্তিশালী শাসক হিসেবে পরিচিত হলেও অন্যদিকে ধর্মীয় উদ্ভট চিন্তার জন্য ইতিহাসে সমালোচিত। তার রাজসভা ছিল বিভিন্ন ধর্মীয় মতের আলোচনাকেন্দ্র, যেখানে হিন্দু, খ্রিষ্টান, জোরোয়াস্ত্রীয় ও মুসলিম পণ্ডিতরা অংশ নিতেন। শুরুতে এটি মুক্ত চিন্তার পরিবেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেও ধীরে ধীরে তা একটি বিকৃত মতাদর্শের জন্ম দেয়।

রাজপণ্ডিত আবুল ফজল ও ফয়েজির প্রভাবে আকবর দ্বীনে ইলাহি নামের একটি নতুন মতবাদ চালু করেন। রাজনৈতিক ঐক্যের অজুহাতে প্রতিষ্ঠিত এই মতবাদে নবীজি (সা.)–এর চূড়ান্ত নবুয়ত অস্বীকার, নামাজ, রোজা ও হজের মতো ফরজ ইবাদতকে অপ্রয়োজনীয় ঘোষণা এবং সম্রাটকে আধ্যাত্মিক নেতার মর্যাদা দেওয়ার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত হয়। ফলে ইসলামি সমাজে ভয়াবহ বিভ্রান্তি ও নৈতিক অবক্ষয় দেখা দেয়।

এ সময় অনেক আলেম ভয়ে কিংবা সুবিধাবাদের কারণে নীরবতা অবলম্বন করেন। এমন অন্ধকার মুহূর্তে এক তরুণ আলেম দৃঢ় কণ্ঠে ঘোষণা করেন, যে ধর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর আনুগত্য নেই, সে ধর্ম আল্লাহর ধর্ম হতে পারে না। এই সাহসী আলেমই ছিলেন শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.), যিনি পরে মুজাদ্দিদে আলফে সানি নামে ইতিহাসে খ্যাত হন।

শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) জন্মগ্রহণ করেন ১৫৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভারতের পাঞ্জাব প্রদেশের সিরহিন্দ নগরে। তার পিতা শায়খ আব্দুল আহাদ ফারুকী (রহ.) ছিলেন নকশবন্দি তরিকার বিশিষ্ট সুফি। বংশগতভাবে তিনি দ্বিতীয় খলিফা হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)–এর বংশধর।

শৈশবকাল থেকেই তিনি অসাধারণ মেধা ও জ্ঞানপ্রতিভার পরিচয় দেন। কোরআন ও হাদিসের পাশাপাশি ফিকহ, যুক্তিবিদ্যা, দর্শন ও তাসাউফে তিনি গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। দিল্লি, আগ্রা ও সামরকন্দের পণ্ডিতদের সঙ্গে তার যোগাযোগ তাকে পরিণত করে এক শক্তিশালী ইসলামি চিন্তাবিদে।

আকবরের ধর্মীয় নীতির ফলে মুসলিম সমাজে ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হয়। মসজিদে নামাজ বন্ধ হয়ে যায়, রাজসভায় ইসলামবিরোধী মতবাদ ছড়াতে থাকে, এমনকি আল্লাহু আকবর ধ্বনির স্থলে জয় আকবর উচ্চারিত হতে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে শায়খ আহমদ সিরহিন্দি (রহ.) কলমকে অস্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তিনি শুরু করেন তার ঐতিহাসিক মাকতুবাতে ইমাম রাব্বানী রচনার মাধ্যমে এক দাওয়াতি আন্দোলন। এসব চিঠি তিনি পাঠান শাসক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, আলেম ও সাধারণ মানুষের কাছে। সেখানে তিনি স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন যে, নবীজি (সা.)–এর শরিয়তই মানবতার একমাত্র মুক্তির পথ এবং দ্বীনে ইলাহি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।

তার যুক্তিনির্ভর আলোচনা ও কোরআন-হাদিসভিত্তিক ব্যাখ্যা সমাজে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি দ্বীনে ইলাহি ত্যাগ করে ইসলামে ফিরে আসেন।

১৬০৫ সালে আকবরের মৃত্যুর পর তার পুত্র জাহাঙ্গীর সিংহাসনে বসেন। প্রথমদিকে তিনি পিতার নীতি অনুসরণ করলেও দরবারি মহলের প্ররোচনায় শায়খ আহমদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের অভিযোগ ওঠে। এর ফলস্বরূপ ১৬১৮ সালে তাকে গ্রেপ্তার করে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দি করা হয়।

কারাবন্দি অবস্থাতেও তার দাওয়াত থেমে থাকেনি। বরং তার চরিত্র, আখলাক ও ঈমানি দৃঢ়তায় প্রভাবিত হয়ে অনেক কারারক্ষী ইসলাম গ্রহণ করেন। অবশেষে জাহাঙ্গীর নিজেই তার মহত্ত্ব উপলব্ধি করে তাকে মুক্তি দেন এবং সম্মানের সঙ্গে রাজসভায় স্থান দেন।

হিজরি এক হাজার বছর পূর্তির সময় পরিচালিত তার সংস্কার আন্দোলনের কারণেই তাকে মুজাদ্দিদে আলফে সানি বা দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক বলা হয়। তিনি শরিয়ত ও তাসাউফের মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করেন এবং ঘোষণা করেন, যে তাসাউফ শরিয়তবিহীন তা ভ্রান্ত, আর যে শরিয়ত তাসাউফবিহীন তা প্রাণহীন।

তার তাওহিদে শুহুদি মতবাদ ইসলামি দর্শনে নতুন মাত্রা যোগ করে। তার চিন্তা ও দাওয়াত পরবর্তী সময়ে শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (রহ.), সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.)সহ বহু সংস্কারকের মাধ্যমে বিকশিত হয়।

মুজাদ্দিদে আলফে সানি (রহ.) আমাদের শিক্ষা দেন, সত্যের পথে চলতে গেলে আপস নয়, ত্যাগের সাহস প্রয়োজন। তার জীবন আজও বিভ্রান্ত সময়ের মানুষের জন্য আলোর দিশারি হয়ে আছে।

সিএ/এসএ

spot_img

আরও পড়ুন

জাকাত ও কর কি একই বিষয়? যা বলছেন ইসলামি বিশেষজ্ঞরা

ইসলামে জাকাত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত হওয়ায় অনেকের মনে...

স্ক্রিনে আসক্তি বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ

মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কথা উঠলে সাধারণত বড় কোনো...

জিন নয়, অভ্যাসই বার্ধক্যের বড় নিয়ামক

বার্ধক্যে অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর জন্য শুধু বংশগত জিন...

তাকওয়া অর্জনে যেসব আমলকে গুরুত্ব দিতে বলছে ইসলাম

ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ...

ডায়াবেটিস রোগীদের কাঁধের ব্যথার ঝুঁকি কেন বেশি

প্রতিদিনের জীবনের অসংখ্য কাজে কাঁধের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চুল...

১১ বছর পর নতুন পে-স্কেল, বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন

সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার পর নতুন জাতীয় বেতন কাঠামো...

অ্যামাজনের উর্বরতার পেছনে লুকিয়ে আছে সাহারার ভূমিকা

পৃথিবীর দুই প্রান্তে অবস্থান করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ভূপ্রকৃতি—সাহারা...

পাঁচ মাসে সহিংসতার শিকার এক হাজারের বেশি নারী ও শিশু

চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে দেশে নারী ও শিশু...

শুধু এআইয়ের ওপর নির্ভর করে ধর্মীয় মাসআলা জানা কতটা গ্রহণযোগ্য?

প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের ব্যবহার দ্রুত...

গরমে ঘরে তৈরি করুন আম-লিচুর ঠান্ডা পুডিং

গ্রীষ্মকাল মানেই আম ও লিচুর মৌসুম। এই দুই জনপ্রিয়...

চীনের মহাপ্রাচীরে লুকিয়ে ছিল সৈন্য ও শ্রমিকদের জীবনের গল্প

চীনের মহাপ্রাচীরকে ঘিরে নতুন এক প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধানে উঠে এসেছে...

ইসলামি দৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে সফল হওয়ার উপায়

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ কাজ বা সিদ্ধান্তে কাঙ্ক্ষিত ফল পেতে হলে...

বিদ্যুৎ ছাড়াই পানি শীতল রাখার সহজ উপায়

গরমের সময়ে ঠান্ডা পানি সংরক্ষণের জন্য আবারও জনপ্রিয় হয়ে...

ডিএনএ পরীক্ষায় মিলতে পারে কেমোথেরাপির বিকল্প সিদ্ধান্ত

স্তন ক্যান্সারের চিকিৎসায় বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন...
spot_img

আরও পড়ুন

জাকাত ও কর কি একই বিষয়? যা বলছেন ইসলামি বিশেষজ্ঞরা

ইসলামে জাকাত একটি বাধ্যতামূলক আর্থিক ইবাদত হওয়ায় অনেকের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়, রাষ্ট্রকে কর প্রদান করা কি আবশ্যক, নাকি কর ফাঁকি দিলে ধর্মীয়ভাবে কোনো...

স্ক্রিনে আসক্তি বাড়াচ্ছে মানসিক চাপ

মানসিক চাপ বা স্ট্রেসের কথা উঠলে সাধারণত বড় কোনো সমস্যা, পারিবারিক সংকট বা কর্মক্ষেত্রের চাপের কথাই সামনে আসে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিদিনের জীবনের কিছু...

জিন নয়, অভ্যাসই বার্ধক্যের বড় নিয়ামক

বার্ধক্যে অসুস্থতা ও অকাল মৃত্যুর জন্য শুধু বংশগত জিন দায়ী নয়, বরং ব্যক্তির জীবনযাপন, পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভ্যাসই বড় ভূমিকা রাখে—এমন তথ্য উঠে এসেছে...

তাকওয়া অর্জনে যেসব আমলকে গুরুত্ব দিতে বলছে ইসলাম

ইসলামে তাকওয়া বা আল্লাহভীতি একজন মুমিনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গুণ হিসেবে বিবেচিত। এটি মানুষের অন্তরে এমন এক আত্মিক শক্তি সৃষ্টি করে, যা তাকে পাপ থেকে...
spot_img