সুন্দরবনে হরিণ ধরার ফাঁদে আটকে পড়া একটি বাঘকে সুস্থ করে আবার বনে ফেরানো নিয়ে তিনটি বড় চ্যালেঞ্জের কথা জানিয়েছেন বন বিভাগ, বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা। তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে বাঘটির শারীরিক অবস্থার উন্নতি হলেও পুরোপুরি শঙ্কামুক্ত বলা যাচ্ছে না। বাম হাতের গভীর ক্ষত, শরীরের পানিশূন্যতা এবং পেশি পুনরুদ্ধার করে বাঘটিকে শিকার উপযোগী করে তোলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তিনটি বিষয় সন্তোষজনকভাবে সমাধান করা গেলেই নির্ভর করবে কবে নাগাদ বাঘটি তার স্বাভাবিক আবাসস্থলে ফিরে যেতে পারবে। বুধবার (৭ জানুয়ারি) দুপুর আড়াইটার দিকে খুলনা প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সুন্দরবন বন বিভাগ ও বনসংরক্ষক দপ্তরের কর্মকর্তা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা এসব তথ্য জানান।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, গত ৪ জানুয়ারি সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জ এলাকা থেকে হরিণ শিকারের ফাঁদে আটকে পড়া প্রায় চার বছর বয়সী একটি নারী বাঘ উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার করার পর বাঘটিকে খুলনায় বন বিভাগের বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে এনে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
খুলনা আঞ্চলিক বন সংরক্ষক ইমরান আহমেদ জানান, শুরুতে বাঘটি অত্যন্ত দুর্বল অবস্থায় ছিল। চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে। এখন সে পানি পান করছে এবং খাদ্য গ্রহণ শুরু করেছে। পাশাপাশি তার স্বাভাবিক ক্ষিপ্ত আচরণও ফিরে আসছে। তবে বন বিভাগের প্রাণী চিকিৎসা কর্মকর্তা হাতেম সাজ্জাদ জুলকারনাইনের নিবিড় তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন থাকলেও বাঘটি এখনও পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এ কারণে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নুর আলী খানের নেতৃত্বে ঢাকা থেকে আগত একটি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দল বুধবার সকালে বাঘটির অবস্থা সরেজমিনে পর্যবেক্ষণ করেন এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত একাধিক পরামর্শ দেন।
ঢাকার সেন্ট্রাল ভেটেরিনারি হসপিটালের এডিশনাল ভেটেরিনারি অফিসার ডা. নাজমুল হুদা বলেন, ফাঁদে আটকে থাকার ফলে বাঘটির সামনের বাম হাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে চলনভঙ্গি পর্যবেক্ষণে হাড় ভাঙার কোনো লক্ষণ পাওয়া যায়নি, যা আশাব্যঞ্জক। তার মতে, দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে বাঘটি সুস্থ হয়ে বনে ফেরার উপযোগী হতে পারে।
তবে তিনি জানান, এজন্য অন্তত তিনটি বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। প্রথমত, বাঘটির ক্ষতিগ্রস্ত বাম হাত শিকার ধরার মতো কার্যকর হবে কিনা। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ সময় ফাঁদে আটকে থাকার কারণে সৃষ্ট পানিশূন্যতা ও শারীরিক দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা। তৃতীয়ত, পেশির ক্ষয় বা দুর্বলতা কাটিয়ে বাঘটিকে পূর্ণ শক্তিতে ফিরিয়ে আনা।
ডা. নাজমুল হুদা আরও বলেন, বনে বাঘটিকে কেউ খাবার ধরে দেবে না। তাকে নিজেই লড়াই করে শিকার ধরতে হবে। সে কারণে বাঘটি যদি শিকার ধরার মতো সক্ষম না হয়, তাহলে তাকে বনে ছেড়ে দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে। তবে সবকিছু বিবেচনায় নিয়েও চিকিৎসকরা আশাবাদী বলে জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে সূচনা বক্তব্য দেন সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বনকর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধূরী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. হাদী নুর আলী খান, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি অনুষদের প্রফেসর ড. মো. গোলাম হায়দার, কেন্দ্রীয় রোগ অনুসন্ধান গবেষণাগারের প্রিন্সিপ্যাল সাইন্টিফিক অফিসার ড. মো. গোলাম আযম চৌধুরী এবং বন বিভাগের ভেটেরিনারি অফিসার হাতেম সাজ্জাদ জুলকারনাইনসহ সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, সুন্দরবনে হরিণ শিকার ও ফাঁদ পাতা চক্রকে ধরতে তদন্ত ও অভিযান চলছে। একই সঙ্গে বাঘ আটকে পড়ার ঘটনাটিও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
বন কর্মকর্তা ও বিশেষজ্ঞরা বলেন, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন ও জীববৈচিত্রপূর্ণ এলাকা হওয়া সত্ত্বেও এ ধরনের ঘটনায় দ্রুত উদ্যোগ নিতে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। দেশে পর্যাপ্ত অঞ্চলভিত্তিক ভেটেরিনারি হাসপাতাল, জরুরি উদ্ধার সরঞ্জাম, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও জনবল সংকট রয়েছে। এসব ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে ওয়াটার অ্যাম্বুল্যান্সসহ প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জনবল বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন তারা।
আহত বাঘটির সংক্রমণ এড়াতে এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে সম্পূর্ণ নিরিবিলি পরিবেশে রাখা হয়েছে। এ কারণে সেখানে অযথা ভিড় না করার জন্য বন কর্মকর্তারা সবাইকে অনুরোধ জানিয়েছেন।
সিএ/এএ


