ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পক্ষে দীর্ঘদিন ধরে কথা বলে আসা মার্কিন রিপাবলিকান সিনেটর Lindsey Graham ইরান সরকারকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার পতন ঘটলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি হবে এবং এতে যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুবিধা পাবে।
গতকাল রোববার মার্কিন সংবাদমাধ্যম Fox News–কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম বলেন, ‘এই শাসনের পতন হলে আমরা একটি নতুন মধ্যপ্রাচ্য দেখতে পাব এবং আমরা বিপুল অর্থ আয় করতে যাচ্ছি।’ তাঁর মতে, ইরান সরকারের পতনের জন্য অর্থ ব্যয় করা ‘সার্থক বিনিয়োগ’ হবে।
গ্রাহাম আরও বলেন, ভেনেজুয়েলা ও ইরানে বিশ্বের প্রায় ৩১ শতাংশ তেল মজুত রয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ‘আমরা এই ৩১ শতাংশ তেলের মালিকানায় অংশীদার হতে যাচ্ছি। এটি চীনের জন্য দুঃস্বপ্ন হবে। এটি একটি ভালো বিনিয়োগ।’
যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের অভিযোগ
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র Esmail Baghaei অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেলসম্পদ নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে। আজ সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘তাদের পরিকল্পনা পরিষ্কার—আমাদের দেশকে বিভক্ত করে অবৈধভাবে তেলসম্পদের দখল নেওয়া।’
গ্রাহাম সাক্ষাৎকারে আরও দাবি করেন, আগামী দুই সপ্তাহে ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা বাড়তে পারে। ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘পুরোপুরি ধ্বংস করে দেবে’ এবং হরমুজ প্রণালিতে আর কেউ যুক্তরাষ্ট্রকে হুমকি দিতে পারবে না।
ট্রাম্প প্রশাসনের যুক্তি
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর অনেক রিপাবলিকান নেতার মতো গ্রাহামও এর প্রতি সমর্থন জানান। ২ মার্চ মার্কিন প্রেসিডেন্ট Donald Trump বলেন, দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ও সম্ভাব্য পারমাণবিক সক্ষমতা যুক্ত ইরান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বড় হুমকি।
তবে অনেক বিশেষজ্ঞের মতে, এই হামলার আইনি ভিত্তি নেই এবং এটি আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হতে পারে।
তেলের দাম বাড়ার প্রভাব
ইরানে হামলার পর বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে প্রতি ব্যারেল ১০০ ডলার ছাড়িয়েছে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ তৈরি হয়েছে। একই সময়ে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে ইরান পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইসরায়েল সফর ও যুদ্ধের প্রস্তুতি
ইরানে হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে গ্রাহাম একাধিকবার ইসরায়েল সফর করেন। সেখানে তিনি ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থা Mossad–এর সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নিজস্ব সরকার আমাকে যা জানায় না, তারা (মোসাদ) আমাকে সেসব তথ্য দেবে।’
মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Wall Street Journal–এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব সফরের সময় তিনি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী Benjamin Netanyahu–এর সঙ্গেও বৈঠক করেন এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে যুদ্ধের বিষয়ে রাজি করানোর উপায় নিয়ে আলোচনা করেন।
পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিতর্ক
তেহরান দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে পরিচালিত। আন্তর্জাতিক সংস্থা International Atomic Energy Agency–ও জানিয়েছে, বর্তমানে ইরানে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির কোনো নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচির প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য, ২০১৫ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট Barack Obama–এর প্রশাসন ইরানের সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। পরে ২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেন।
যুদ্ধপন্থী অবস্থানের জন্য পরিচিত গ্রাহাম
মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন যুদ্ধে সমর্থনের কারণে সিনেটর গ্রাহামকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম ‘যুদ্ধপন্থী’ রাজনীতিক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০০৩ সালের Iraq War–সহ গত দুই দশকের বেশির ভাগ সামরিক হস্তক্ষেপের পক্ষেই তিনি অবস্থান নিয়েছেন।
সাক্ষাৎকারে গ্রাহাম ইঙ্গিত দেন, ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের নজর কিউবার দিকেও যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার এই ক্যাপটা দেখছেন? এতে লেখা—ফ্রি কিউবা। অপেক্ষা করুন, কিউবার মুক্তি আসন্ন।’
সিএ/এমই


