যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের জন্য ইরান প্রস্তুত রয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির শীর্ষ পর্যায়ের একজন কর্মকর্তা। একই সঙ্গে তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে হামলা অব্যাহত রেখে ইরান এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে আঞ্চলিক দেশগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এই সংঘাত থেকে সরে আসতে চাপ দেয়।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতার পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা কামাল খারাজি তেহরান থেকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সংবাদমাধ্যম সিএনএনকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেন। তিনি জানান, বর্তমান পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে এই সংকট সমাধানের সম্ভাবনা খুবই কম এবং যুদ্ধ শেষ হতে পারে মূলত অর্থনৈতিক চাপের কারণে।
কামাল খারাজি বলেন, ‘আমি কূটনীতির আর কোনো সুযোগ দেখি না। কারণ, ডোনাল্ড ট্রাম্প অন্যদের প্রতারিত করেছেন এবং নিজের প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছেন না। দুই দফা সমঝোতা আলোচনার সময় আমাদের এই অভিজ্ঞতা হয়েছে। আমরা যখন আলোচনায় যুক্ত ছিলাম, তখনই তারা আমাদের ওপর আঘাত হেনেছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধ অন্যদের ওপর ব্যাপক চাপ-অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে। মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি-সংকট ব্যাপক অর্থনৈতিক চাপ তৈরি করছে এবং এটা চলতে থাকবে। যুদ্ধ চলতে থাকলে চাপের মাত্রা আরও বাড়বে। তখন অন্যদের হস্তক্ষেপ করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।’
খারাজির বক্তব্য অনুযায়ী, অর্থনৈতিক চাপ এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যে উপসাগরীয় আরব দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে বাধ্য হবে। তখনই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধ করার উদ্যোগ জোরালো হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি।
চলমান সংঘাতের মধ্যে ইরান মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। তেহরানের দাবি, উপসাগরীয় দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করেই এসব হামলা পরিচালনা করা হচ্ছে। তবে বিভিন্ন আবাসিক এলাকা এবং বিমানবন্দরও হামলার শিকার হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
এই সংঘাতের প্রভাব ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে পড়তে শুরু করেছে। যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ-চলাচল প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। সোমবার আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যা বিশ্ববাজার ও সাধারণ মানুষের ব্যয়ের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, চলমান সংঘাতের কারণে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ১৯৫৬-৫৭ সালের সুয়েজ খাল সংকটের সময়ের তুলনায়ও এই পরিস্থিতি প্রায় দ্বিগুণ প্রভাব ফেলতে পারে।
ইরানের রেভোল্যুশনারি গার্ড কোরের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটি ও কৌশলগত স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে হামলা চালাতে তেহরান তাদের সামরিক সক্ষমতার প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহার করছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় নিহত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির পর ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে মোজতবা খামেনির নাম ঘোষণা করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই নেতৃত্ব পরিবর্তন সংঘাতকে আরও তীব্র করে তুলতে পারে।
ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব ভবিষ্যতেও একই অবস্থান বজায় রাখবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে খারাজি বলেন, ‘হ্যাঁ, ঠিক তাই।’ তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিরক্ষা নীতির নেতৃত্ব দেওয়া ইরানের সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব এবং নতুন নেতৃত্ব সেই নীতিই অনুসরণ করবে।
অন্যদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প গত সপ্তাহে বলেছেন, মোজতবা খামেনির নেতৃত্ব গ্রহণ তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে খারাজি বলেন, ‘এটি তাঁর (ট্রাম্পের) বিষয় নয়।’
মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) প্রকাশিত এই সাক্ষাৎকারে ইরানের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
সিএ/এমই


