বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের রায় ঘোষণা করেছে। তবে ভারতের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ভারত সরকার এখনও নিশ্চিত কোনো অবস্থান নেনি যে, তারা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করবে।
ভারতের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম বিবিসিকে জানিয়েছে, রায়ের ফলে দিল্লির অবস্থান বদলাচ্ছে না। ভারত সরকার এর আগে ৫ আগস্ট ২০২৪ থেকে শেখ হাসিনাকে ‘সাময়িক’ আশ্রয় দিয়েছে, যা কেবল তার নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে নেওয়া হয়েছিল। এই অবস্থান এখনও অপরিবর্তিত, এবং ভারত এখনও শেখ হাসিনাকে ফেরত দেয়ার কোনো প্রস্তুতি নিচ্ছে না।
প্রত্যর্পণ চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ২০২৩ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের কাছে একটি কূটনৈতিক নোট বা নোট ভের্বাল পাঠায়। এতে শেখ হাসিনাকে হস্তান্তরের অনুরোধ করা হয়েছিল। যদিও ভারতের পক্ষ নোটটির প্রাপ্তি স্বীকার করেছে, তারপর থেকে তারা আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একান্ত আলোচনায় ভারতীয় কর্মকর্তারা বারবার জানিয়েছে, প্রত্যর্পণ চুক্তিতে প্রচুর ফাঁকফোকর রয়েছে, যা ব্যবহার করে তারা অনুরোধ নাকচ বা স্থগিত রাখতে পারে।
গত বছরের ডিসেম্বরের তুলনায় বর্তমানে পরিস্থিতি ভিন্ন। তখন শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক চার্জ গঠন হয়নি, আদালতের শুনানি শুরু হয়নি। আজ তিনি বাংলাদেশের আদালতে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য সাজাপ্রাপ্ত। ভারতের ওপর চাপ বেড়েছে কেন তারা একজন দণ্ডিত অপরাধীকে আশ্রয় দিচ্ছে এবং বাংলাদেশকে হস্তান্তর করতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে।
২০১৩ সালে স্বাক্ষরিত প্রত্যর্পণ চুক্তির ধারা অনুযায়ী, যদি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক প্রকৃতির হয়, তবে অনুরোধ খারিজ করা যায়। তবে হত্যাকাণ্ড, গুম, অনিচ্ছাকৃত হত্যা, বোমা বিস্ফোরণ ও সন্ত্রাসবাদসহ গণহত্যা রাজনৈতিক প্রকৃতি হিসেবে বিবেচিত হবে না। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যে অভিযোগগুলি রয়েছে, তা হত্যাকাণ্ড, গুম এবং নির্যাতনের অভিযোগের অন্তর্ভুক্ত।
চুক্তি ২০১৬ সালে সংশোধিত হলে, অনুরোধকারী দেশকে প্রমাণপত্র উপস্থাপন না করলেও হস্তান্তর কার্যকর করার সুযোগ নিশ্চিত করা হয়। তবে চুক্তিতে এমন ধারা আছে, যেগুলো অনুরোধ নাকচ করতে পারে, যেমন অনুরোধ-প্রাপক দেশ যদি মনে করে অভিযোগগুলো ন্যায্য ও সুষ্ঠু বিচারের উদ্দেশ্যে আনা হয়নি। এছাড়া, অভিযুক্ত সামরিক অপরাধের সঙ্গে যুক্ত হলে বা অপরাধ সাধারণ ফৌজদারি আইনের বাইরে গেলে অনুরোধ খারিজ করার সুযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, ভারত এই ধারা ব্যবহার করে বলছে যে, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ শুধুমাত্র ন্যায্য বিচারের স্বার্থে আনা হয়নি। এ কারণেই তারা তাকে হস্তান্তর করছে না। আবারও বলা যায়, ভারত কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই অবস্থান অটল রেখেছে, এবং খুব সম্ভবত তারা শেখ হাসিনাকে ফেরত দেবার কোনো তৎপরতা দেখাবে না।
চাপ সত্ত্বেও ভারতের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে এখনও অটল। বাংলাদেশ থেকে হস্তান্তরের অনুরোধ থাকলেও ভারত এই মুহূর্তে তার নৈতিক ও কূটনৈতিক দায় এড়াচ্ছে। বিশ্লেষকরা মনে করেন, আন্তর্জাতিক চাপ বা অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপে ভারতকে হয়তো কিছু ব্যাখ্যা দিতে হতে পারে, তবে শেখ হাসিনাকে বাস্তবে হস্তান্তর করা খুবই সম্ভাবনা কম।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
সিএ/এমআরএফ


