সীমান্তকে কেন্দ্র করে নতুন করে উন্মুক্ত সংঘর্ষে জড়িয়েছে পাকিস্তান ও আফগানিস্তান। এর জেরে রাজধানী কাবুলসহ আফগানিস্তানের বিভিন্ন স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। প্রতিরক্ষা মন্ত্রী খাজা আসিফ ঘোষণা দিয়েছেন—দুই দেশ এখন “খোলামেলা যুদ্ধে” প্রবেশ করেছে।
সিএ/এসএ
ছবি: সংগৃহীত
উত্তেজনা কীভাবে শুরু হলো?
আফগান তালেবান মুখপাত্র জাবিউল্লাহ মুজাহিদ দাবি করেন—আফগান বাহিনী ডুরান্ড লাইনে পাকিস্তানি সামরিক অবস্থানের বিরুদ্ধে “বৃহৎ আক্রমণ” চালাচ্ছে। এর জবাবে ইসলামাবাদ কাবুল, কান্দাহার ও পাকতিয়া প্রদেশে বিমান হামলা চালায়।
২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের ক্ষমতায় ফেরার পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় ছোট-বড় সংঘর্ষ চলছিল। ২০২৫ সালের এক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর যুদ্ধবিরতি হলেও উত্তেজনা আবার চরমে পৌঁছায়।
কী ঘটেছে সাম্প্রতিক সংঘর্ষে?
পাকিস্তানি সেনাদের ওপর হামলার অভিযোগে শুক্রবার ভোরে আফগানিস্তরের ভেতরে বিমান হামলা শুরু করে পাকিস্তান।
আফগান বাহিনী পাল্টা বিমানবিধ্বংসী গুলি চালায়।
পাকিস্তান জানায়—কান্দাহারে তালেবানের ব্রিগেড সদর দপ্তর, গোলাবারুদ ডিপোসহ বহু স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।
খাইবার পাখতুনখোয়ার চিত্রাল, খাইবার, বাজাউর, কুররামসহ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোতেও আফগান তালেবানদের লক্ষ্য করে হামলা হয়।
তোরখাম সীমান্তে দুই পক্ষের গোলাগুলি চলছে।
হতাহতের সংখ্যা নিয়ে দুই পক্ষের ভিন্ন দাবি
পাকিস্তানের দাবি
নিহত ১৩৩ আফগান তালেবান
আহত ২০০+
ধ্বংস ২৭ তালেবান পোস্ট
দখল ৯ পোস্ট
ধ্বংস ৮০+ ট্যাঙ্ক/আর্টিলারি/সাঁজোয়া যান
আফগানিস্তানের দাবি
নিহত মাত্র ৮ তালেবান যোদ্ধা
আহত ১১
পাল্টা হামলায় নিহত ৫৫ পাকিস্তানি সেনা
দখল ১৯ পাকিস্তানি পোস্ট
দুই পক্ষের দাবিই পরস্পরবিরোধী এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
দুই দেশ কেন লড়াই করছে? মূল কারণগুলো
১. ডুরান্ড লাইন—বিতর্কিত সীমান্ত
২,৬১১ কিমি দীর্ঘ এই সীমান্ত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে নির্ধারিত।
আফগানিস্তান এটিকে কখনোই আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
তাদের অভিযোগ—এটি পশতুন জনগোষ্ঠীকে দুই ভাগ করেছে।
২. টিটিপি (তেহরিক–ই–তালেবান পাকিস্তান) ইস্যু
পাকিস্তানের অভিযোগ—আফগান তালেবান টিটিপি যোদ্ধাদের আশ্রয় দিচ্ছে।
টিটিপি পাকিস্তানে বহু হামলার দায় স্বীকার করেছে।
আফগান তালেবান ও টিটিপির মধ্যে আদর্শিক–সামাজিক ঘনিষ্ঠ বন্ধন রয়েছে।
কাবুল আশঙ্কা করে—টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তারা আইএসকেপি-তে যোগ দিতে পারে, যা তালেবানের জন্য বড় হুমকি।
৩. সীমান্ত নিরাপত্তা সংকট
২০২১ সালের পর থেকে আফগান–পাক সেনাদের মধ্যে ৭৫+ সংঘর্ষ হয়েছে।
পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখোয়া ও বেলুচিস্তানে হামলা বেড়েছে, যার জন্য ইসলামাবাদ আফগানিস্তানকে দায়ী করছে।
বিশ্লেষকদের মতে পরিস্থিতির গুরুত্ব
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক হামলাগুলো “আরো আক্রমণাত্মক ও প্রত্যক্ষ”—যা তাদের কৌশলগত পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
আফগানিস্তানের বিমান বাহিনী না থাকায় অসম যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
আফগান তালেবান বেশি ব্যবহার করছে—আত্মঘাতী হামলাকারী, কামিকাজে ড্রোন ও গেরিলা কৌশল।
যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে আফগানিস্তানই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে মনে করেন সামরিক বিশ্লেষকরা।
ভারত, জাতিসংঘ ও অন্যান্য দেশের অবস্থান
ভারত পাকিস্তানের বিমান হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেছে—ইসলামাবাদ নিজের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপাচ্ছে।
জাতিসংঘ দুই দেশকে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা ও যুদ্ধবিরতির আহ্বান জানিয়েছে।
ইরান ও রাশিয়া সংলাপ ও কূটনৈতিক সমাধানে জোর দিয়েছে; রাশিয়া মধ্যস্থতার প্রস্তাবও দিয়েছে।
সীমান্ত, টিটিপি, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক কৌশল—সব মিলিয়ে পাকিস্তান–আফগানিস্তান সম্পর্ক বর্তমানে সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে। বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন—টিটিপির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে বড় যুদ্ধ অনিবার্য। তবে উভয় দেশই সরাসরি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ালে তার ভয়াবহ প্রভাব পড়বে পুরো দক্ষিণ এশিয়ায়।
সিএ/এসএ


